আনন্দের জন্য খুঁজি বিস্ময়
-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
ছোটবেলাতেই জানা হয়ে গেছিল একটাই
মাত্র আকাশ আর সেটা অনেক বড়। তবু স্কুলের সামনে বিশাল মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে তাকালে
মনে হত মাঠ থেকে অনেকটা দূরে যে অনেক বড় বাগান আর তার পরে জঙ্গল, ঠিক তার পরেই শেষ
হয়ে গেছে আকাশটা। তার পরের অন্য গ্রামগুলোতে অন্য আকাশ। তাহলে সবাই যে বলে আকাশ একটাই,
কি করে হয় সেটা? চোখের সামনে তো দেখতে পাচ্ছি আকাশটা শেষ হয়ে গেছে। বিস্ময়ের আর
ঘোর কাটতনা।
সেই বিস্ময়টাকে আকুল হয়ে
খুঁজি এখন। বড়দের জীবনে, ছোটদের মধ্যেও। বিস্ময় থেকে উঠে আসে আনন্দ। জীবনে আনন্দ
যোগ হলে জীবন সুন্দর হয়। কিন্তু কোথায় বিস্ময়? ছোটবেলা বড়বেলা কোথাও বিস্ময় নেই। শিশুদের
সময় নেই আকাশের দিকে তাকানোর বা তা নিয়ে কিছু কল্পনা করার। কেউ চায়না সে কিছু দেখে
বা শুনে বিস্মিত হোক। বরং সবাই চায় তার জানার পরিধি বাড়ুক, জ্ঞানের ভাণ্ডার দ্রুত
উপচে পড়ুক। তাই তার কাছে কারও উপস্থিতি
বা অনুপস্থিতি বড় একটা ম্যাটার করেনা। অজস্র দামী খেলনায় তার খেলার আনন্দ উপভোগের
সুযোগ নেই, খেলায় তৃপ্তি নেই। টিভির কার্টুনে, বিজ্ঞাপনে, মোবাইলের নানান ম্যাজিকে
অনেকটা সময় ব্যস্ত থেকে তার আর অন্য কিছু ভাববার অবসর নেই। কি থেকে কি হয় - কত
কিছু জেনে যায় সে অল্প বয়সেই! কত ছোটতেই প্লে স্টোর ঘেঁটে মোবাইলে এ্যাপ ডাউনলোড
করতে পারে সে। মা বাবারাও গর্বিত হন এই ভেবে – তাঁদের সন্তান
কতকিছু জানে। তার জ্ঞান বাড়তে থাকে। ধারণার বিস্তার হয়। কিন্তু বিস্ময় তো সেখানে থাকেনা। যেখানে টাচ
করলে যা আসবার তাই আসছে, এতে বিস্ময়ের কি আছে! কল্পনার জগতের দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়
তার কাছে।
অল্প বয়সে নির্মোহ হয়ে
যাওয়া কতটা ভালো তা জানা নেই। বরং জীবনকে যাতে হাজারো রঙে সাজাতে পারে সেই
শিক্ষাটা পেলে অনেক সমৃদ্ধ হবে ভবিষ্যৎ। মা বাবা চান সন্তান বিস্ময়কর হয়ে উঠুক। তাঁরা বোধ হয় চাননা সন্তানের মনের
মধ্যে গড়ে উঠুক বিস্ময়বোধ। মানুষ নিজে বিস্ময়কর হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘদিনের সাধনা আর
যোগ্যতার ফলে। কিন্তু বিস্মিত হওয়ার জন্য নানা উপকরণ ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। শুধু
দরকার সেদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া। কোথায় যেন পড়েছিলাম, যে যত তুচ্ছ জিনিস নিয়ে বিস্মিত হতে পারে
সে তত সুখি মানুষ। যার সব জানা হয়ে গেছে তার মত দুর্ভাগা আর নেই।
আমরা ক্রমশ সেই ‘দুর্ভাগা’
হয়ে যাচ্ছি। কেউই আর তেমন বিস্মিত হইনা। বিস্ময় কোথায়? ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ঢুকে পড়ে
পরিক্রমা করছি উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু। সামান্য ছোঁয়ায় খুলে যাচ্ছে এক একটা মায়াজগতের
অদ্ভুত সব দরজা। সবটাই হয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক ভাবে। কই, বিস্মিত হচ্ছিনা তো! খবরের
কাগজের কোন হেডলাইনও আর বিস্ময় জাগায়না। আসলে সভ্যতা যতটা এগিয়ে দেয় সেখান থেকে আর
পিছন ফিরে তাকানো যায়না। জীবনকে ঘিরে রাখে অঘটন- ঘটন-পটীয়সী সময়। সেখানে সবকিছুই
ঘটনা। বিস্ময়ের কিছু নেই। যেন এরকমই হবার কথা ছিল। তাই মুখ বন্ধ রেখে সহনশীলতার পরীক্ষা দিই। এক সর্বংসহ
চেতনাকে আঁকড়ে থাকি আর মনে মনে খুঁজতে থাকি তেমন কোন বিস্ময় আর বিস্মিত মানুষের
মুখ। আনন্দের জন্য। মনে পড়ে হুমায়ূন আহমেদের একটি উক্তি, ‘সত্যিকারের বিস্মিত মানুষদের মুখ দেখা
আনন্দের ব্যাপার। বেশিরভাগ মানুষই বিস্মিত হওয়ার ভান করে,
বিস্মিত হয়না!’
-----
Comments
Post a Comment