এক বাঁও মেলেনা,
দো বাঁও মেলেনা
-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
“ফটিক খালাসিদের
মতো সুর করিয়া বলিতে লাগিল, “এক বাঁও
মেলেনা। দো বাঁও মেলে—এ—এ না”। কলিকাতায় আসিবার সময় কতকটা রাস্তা স্টীমারে আসিতে হইয়াছিল, খালসিরা কাছি
ফেলিয়া সুর করিয়া জল মাপিত; ফটিক প্রলাপে তাহাদেরই অনুকরণে করুণস্বরে জল মাপিতেছে
এবং যে অকূল সমুদ্রে যাত্রা করিতেছে, বালক রশি ফেলিয়া কোথাও তাহার তল পাইতেছে না”।
বলা বাহুল্য,
রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের এই অংশটি চোখে ভেসে উঠবে প্রায় সবারই। সেই অকূল
সমুদ্রে যাত্রা চলছে আজও। এখন শুধু ফটিক একা নয়, আমরা সবাই রশি ফেলে মেপে দেখতে
চাইছি আর নীরবে উচ্চারণ করছি “এক বাঁও মেলেনা। দো বাঁও মেলে—এ—এ না”।
মিলবে কি করে? যারা
মিলিয়ে দিতে পারত, তারা ত বিপথগামী। তারা তো নিয়ন্ত্রক। যুক্তি বুদ্ধি বিবেক আর
ন্যায় অন্যায় বোধ তাদের অনেকের কাছেই অর্থহীন। সীমাহীন লোভ, ঔদ্ধত্য আর সাধারন
মানুষকে নিতান্ত হাতের পুতুল মনে করে সময়ের চাকাকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার
স্পর্ধা যেন তাদের জন্মগত অধিকার। অন্যের মাথার উপর ছড়ি ঘোরানো তাদের বড় আরামের
খেলা। দেশকে ভালোবাসার কথা বলে, মানুষের সেবা করার শপথ নিয়ে সেসব তাড়াতাড়ি ভুলে
যাওয়াই তাঁদের অত্যন্ত প্রিয় অভ্যাস। তবে তাঁরাও বিনিময়ে কিছু দেন। অকৃপণ হাতে তাঁরা উপহার দিতে পারেন ভয়,
বিভ্রান্তি, প্রতিবাদ-হীনতা। তাই বিক্রি হয়ে যায় অরণ্য, পাহাড়, নদী নালা, স্বপ্নের
বাসভূমি।
একটা অসুস্থ
সময় যেন। তার হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছি আমরা সবাই। এক অসুস্থতা থেকে আর এক অসুস্থতার
দিকে। কোন লক্ষ্য নেই। পথে কোন উপভোগ্য রোমাঞ্চ নেই। নীতি হীন বল্গাহীন এক দৌড়ের
টান শুধু অপটু পায়ের পাতায়। কেউ পিষে গেলে যাক। কেউ পড়ে থাকলে সেটা তার নিয়তি। কেউ
প্রতিবাদ করলে সেটাও তার বেহিসেবি বাড়াবাড়ি। দ্রুত এইভাবে পালটে যাচ্ছে জীবনের
মানে। এগিয়ে যাওয়া সভ্যতা শুষে নিচ্ছে কোমলমতি ভাবনাসুত্র। অকারণে রক্তাক্ত হয়ে
উঠছে অন্তর। ঈর্ষা আর স্বার্থের দ্বন্দ্বে অহেতুক রণক্ষেত্র হয়ে উঠছে আনন্দঘন
ময়দান। দৌড়ে যাচ্ছি অমানুষিক নিষ্ঠুরতা আর বর্বরতার দিকে। মানুষের স্বাভাবিক
মৃত্যুর আর গ্যারান্টি থাকছেনা।
কেন ঘটে যাচ্ছে
এরকম? বড় একটা বিস্ময় জাগেনা। আমিও এড়াতে পারিনা দায়ভার। অনেক সত্যকে ভুলে যাই বড়
সহজে। বড় নির্লিপ্ত হয়ে থাকি আমরা। চোখে দেখেও বোঝাতে থাকি কিছু দেখিনি, কানে
শুনেও ভাব করি কিছু শুনিনি। প্রতিবেশীর প্রতি এসময় কোন দায় নেই আমার। নাজিম হিকমত
এর মতো জেলখানার কবি হতে চাইনা আমরা। শুধু কি ভয়? নাকি আমার নির্লিপ্ততাও দায়ী
অনেকটা? মেলেনা। এক বাঁও দো বাঁও কোন বাঁওই মেলেনা কিছুতেই। এক অকূল সাগর যেন।
অনিশ্চয়তার, হতাশার, নির্বুদ্ধিতার। অথচ এর অবসানই তো চেয়ে এসেছে সবাই।
-----
Comments
Post a Comment