একলা এবং একাকীত্ব

           -তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

 

বড় একা লাগে, এই আঁধারে...জনপ্রিয় বাংলা ছবির এই গানটি প্রায় সকলেরই শোনা। কিন্তু যে আর্তিটি বেরিয়ে আসে কথাগুলি থেকে, যে বেদনার ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে থাকে অস্তিত্বের চারপাশে, তা শুধু যাঁদের এরকম একালাগে, তাঁরাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারেন। একা লাগা কখনও কখনও অস্তিত্বের শিকড় ধরে টান মারে, মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলে অজানা আশংকা আর অনর্থক ইনসিকিউরিটি।

 

একাকীত্ব আসলে কি? নিজে নিজে একা থাকতে চাওয়া? ঠিক তা নয়। একা থাকতে চাওয়া তো অনেকটাই স্বাভাবিক। নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, এগুলো ব্যবহারিক জীবনে অনেক সময় প্রয়োজন হয়ে পড়ে  মানসিক দৃঢ়তার জন্যও। ঘটনাচক্রেও অনেককে একা থাকতে হয়। আবার  কখনো কখনও  অনেক মানুষের ভিড়েও নিজেকে মনে মনে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে একটু একা থাকা অনেকেই পছন্দ করেন এবং তা হয়তো খারাপ কিছু নয়।

 

কিন্তু একাকীত্ব ব্যাপারটি আর একটু জটিল। স্বেচ্ছায় আরোপিতও ঠিক নয়। একাকীত্ব এক বিশেষ বোধ বা উপলব্ধি যা সৃষ্টি হতে পারে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, পারিবারিক সমস্যা, অসুখী দাম্পত্য, রিলেশনশিপে ব্রেক আপ, দীর্ঘদিন ধরে বয়ে চলা দুশ্চিন্তা বা আরও অন্য অনেক উপসর্গ থেকে। একাকীত্ব মানুষকে উতলা করে তোলে, চাপা অসন্তোষ আর ভয়ের চাদরে ঢেকে রাখে সর্বক্ষণ। রাগ, দুঃখ, অভিমান জমাট বাঁধতে বাঁধতে যখন শক্ত পাথরের মতো হয়ে যায়, যখন কেউ  মনে করে বিশাল সমুদ্রে একটি জাহাজের মত সে একা, একেবারে নিঃসঙ্গ, তার পাশে কেউ নেই, তার কোন গুরুত্ব নেই, মর্যাদা নেই, এ জগতে তার কিচ্ছু করার নেই, কোনও কিছুতেই তার আর কোন প্রয়োজন নেই, তখনই তাকে গ্রাস করে একাকীত্ব। অবধারিত ভাবে সঙ্গে থাকে এক তীব্র শূন্যতাবোধ। মনের ভিতরে অন্য কারও উপস্থিতির চাহিদা। বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় থাকেনা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কোথাও কিছু বিচ্যুতি তো নেই, বরং নিখুঁত ছিমছাম সাজানো সবকিছু। কিন্তু ভিতরে ভিতরে খেয়ে চলে সময়ের ঘুণপোকা, সবার অজান্তে। বুঝতে পারেনা সে নিজেও। শুধু অনুভব করে কোথাও সে বড় একা। বাইরের ঝলমলে আলোর মধ্যে থেকেও তার ভিতরটা বড্ড অন্ধকার। ভিতরে ভিতরে একটু একটু করে যেন সে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অমূলক ভয় আর অসম্ভব উৎকণ্ঠায় কাউকে পাশে পেতে চায় সর্বক্ষণ।

 

দেহের উপসর্গ যেগুলি, যেমন ব্লাড প্রেশার, সুগার ইত্যাদি, সেগুলির প্রকাশ আছে। তীব্রতা মাপা যায়। একাকীত্ব সেভাবে মাপা যায়না। প্রবেশ করতে হয় মনের গভীরে। সেটি পারেন বিশেষজ্ঞরাই।  লাগামহীন একাকীত্ব আর তা থেকে ভয় আর প্যানিক মানে এক অসুখ, যার নাম মনোফোবিয়াবা অটোফোবিয়াসবসময় একা হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা ভিতরটাকে কুরে কুরে খায়। আঁকড়ে ধরতে চায় কোন অবলম্বন। যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতির বিচার করার মত মনের জোর থাকেনা আর। আত্মবিশ্বাস জিরো তে নেমে যায়।

 

দু একটি ছবি তুলে ধরা যেতে পারে এই প্রসঙ্গে। এক তরুণী কলেজে এডমিশন নিয়েও কলেজ যেতে পারেনা। আসলে একা একা যেতে সে ভয় পায়। তার স্কুলের দিনগুলি কেটেছে মা বাবার সান্নিধ্য ছাড়াই। যা পেয়েছে খুবই সামান্য। দুজনাই চাকরি করেন, তাই সেভাবে সময় দিতে পারেননি কেউ। তার মা বাবার মধ্যে সম্পর্কও ভালো নয়। একই বাড়িতে আলাদা আলাদা ঘরে থাকেন যে যার নিজের মত। মেয়েটিরও আলাদা ঘর, কিন্তু সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে। পাছে কিছু ঘটে যায় অঘটন। শৈশব থেকেই বেশির ভাগ সময় একা একা থাকতে থাকতে তার মধ্যে এমন একটা শূন্যতাবোধ তৈরি হয়েছে যে বড় হয়ে গিয়েও একা থাকতে ভয় পায়। শেষ পর্যন্ত পাড়ারই এক বান্ধবী যখন ভর্তি হয় একই কলেজে একই সাবজেক্ট নিয়ে, সে স্বস্তি পায়। কলেজে যাওয়া থেকে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত পাশে পাশে থাকে সেই বান্ধবীর। এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ছাড়তে চায়না। একটা অজানা উদ্বেগের মধ্যে থাকে, পাছে একা থাকলে কোন অসুবিধায় পড়ে, কোন বিপদ হয়। অন্যরা দেখে ভাবে দুজনের মধ্যে ভীষণ ভাব, এক মুহূর্তও কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারেনা। কিন্তু আসলে তা নয়। বান্ধবীও বিরক্ত হয় তার এই আচরণে। কিন্তু সে নিরুপায়।

 

আর একটি ঘটনায় এক বয়স্ক ব্যক্তি অযথা আশংকায় উদ্বিগ্ন থাকেন সব সময়। তিনি পরিবারে দেখেছেন প্রিয়জনদের মৃত্যু। কারও বা অকালমৃত্যু। শোক আর হতাশার আবহ তাঁর মনে জন্ম দিয়েছে এক নাছোড় উৎকণ্ঠা। কল্পনা করেন এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের। তিনি ভাবেন, যার উপরে অনেকখানি নির্ভর করেন তিনি প্রতিদিনের জীবন যাপনে, সেই জীবন সঙ্গিনীর যদি মৃত্যু হয় তাঁর আগেই, তাহলে তিনি বাঁচবেন কি করে? সেই একলা থাকা তিনি সহ্য করবেন কিভাবে? যুক্তি বা বাস্তবতা নয়, কাল্পনিক ভয় আর আশংকায় ডুবে থেকে চরম একাকীত্বের শিকার হন তিনি বিনা কারণে।

 

এগুলি আসলে একটা অবসেশন। মনের মধ্যে জমতে থাকা ভয় আর উৎকণ্ঠা কাউকে ঠেলে দিতে পারে অন্ধকারের কিনারে। এরকম উদাহরণ কিছু কিছু দেখা যেতেই পারে সমাজের আনাচে কানাচে। কিন্তু যখনই তা স্বাভাবিকের মাত্রা ছাড়িয়ে চলে যায় বাতিকের পর্যায়ে, অকারণ ভয় আর উৎকণ্ঠা এসে শ্বাস টিপে ধরে, তখনই প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শের। ভয়ের কারণগুলিকে বুঝে নিয়ে আলোচনা, পরামর্শ আর প্রয়োজনে আরও কিছু ব্যবস্থা নিলেই আস্তে আস্তে ভয় কেটে যায়। কর্পোরেট ব্যস্ততার যুগে অবসর নেই মানুষের। কে আর সেভাবে পারে অন্যকে সময় দিতে? যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবেলা একাই করা যায় এই মানসিক প্রস্তুতিটুকু প্রয়োজন। আমি পারবো, আমি একাই পারবো। আমার যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস আছে”, এই বোধটুকু তাঁর মধ্যে জাগিয়ে দিতে পারলেই তিনি স্বাভাবিক। একাকীত্ব আর তখন ভয়ের থাকেনা। কেননা তিনি মানসিক রোগী নন। এটা একটা মানসিক অস্থিরতা মাত্র।

 

একাকীত্বকে আবার অনেকেই সহজে অস্বীকার করতে পারেপড়াশুনা বা কর্মসূত্রে অনেক ছেলেমেয়েই বাইরে থাকে। পরিবার থেকে অনেক দূরে, ভিন্ন শহরে বা ভিন্ন দেশে। তারা একাকীত্বকে কাজে লাগায়। সেটা যেন তাদের কাছে মস্ত একটা সুযোগ। নিজের মত থাকা, নিজেকে নিজের পছন্দে গড়ে তোলা, অন্যদের সঙ্গে ইন্টার‍্যাক্ট করা, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর থেকে টার্গেট ফুলফিল করা, এগুলোই তাদের কাছে তখন প্রাইম অবজেক্ট হয়ে ওঠে। পরিবারের লোকজন এবং বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটাও খুব সহজ এখন। এই পরিস্থিতিটাও তারা বুদ্ধির সঙ্গে কাজে লাগায়। তারা যেমন ঠাকুর দেখার ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে একলা করে নিতে পারে, তেমনি একাকীত্ব বোধটাকেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। আসলে এটা নির্ভর করে কার কেমন মাইনণ্ডসেট তার উপর। দরকার আত্মবিশ্বাস। এখন নারী পুরুষ নির্বিশেষে একা থাকা অনেক মানুষই গিয়ে বসেন কফিশপে, রেস্তোরায়। চলে যান মাল্টিপ্লেক্সে। একলা থাকাটা এনজয়করেন তাঁরা। নারী, পুরুষ, অনেকেই এরকম স্বচ্ছন্দে একলা কাটিয়ে দেন  সারাটা জীবন। অনেক বয়স্ক বাবা মা যাদের ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনা বা কর্মসূত্রে বাইরে, তাঁরাও কখনো একাকীত্ব বোধ করেন না তা নয়। কিন্তু সেটাকে গুরুত্ব দেননা। বেশির ভাগই মনে রাখেন পৃথিবীটা ছোট হতে হতে এখন একটা গ্রামের মত। অহেতুক উৎকণ্ঠায় দিন না কাটিয়ে বরং পরিস্থিতিটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করেন। এই সময় যেমন যান্ত্রিকতা দিয়েছে, একাকীত্ব দিয়েছে, তেমনি ইন্টারনেটও দিয়েছে। সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট দিয়েছে। ভার্চুয়াল সান্নিধ্যও কম কিছু নয়, শুধু স্পর্শের অপেক্ষা। দরকার বাস্তবকে উপলব্ধি করার মানসিকতা। আসলে একাকীত্বকে উদযাপন করতে পারলেই তা আর একাকীত্ব থাকেনা, হয়ে ওঠে সম্ভাবনার, আনন্দের।

 

                                           -----

Comments

Popular posts from this blog