কাঁসাইয়ের তীরে এক স্বপ্নের কাণ্ডারি

                      -তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

 

নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করে যাওয়াটা অনেকের নেশা, আর ভালোবাসাও। তা থেকে পাওয়া যায় যে অনির্বাণ আনন্দ সেটিই যেন জীবনের এক পরম পাওয়া তাঁর কাছে। সমাজ সভ্যতা ইতিহাস সংস্কৃতি ঐতিহ্য তার কাছে যে আবেদন নিয়ে আসে, তা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে সমস্ত বাধা বিঘ্ন, অপমান, অসহযোগিতা তুচ্ছ করে এগিয়ে যেতে। লক্ষ্যে অবিচল থেকে সেই কাজে যদি আংশিকও সফল হওয়া যায় তাহলে তাঁর মুখে আর সমস্ত চেতনা জুড়ে যে আনন্দের আলোটি ছড়িয়ে যায় তার তুলনা হয়না।

 

মেদিনীপুর শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে হাতিহলকা গ্রামের মহঃ ইয়াসিন পাঠান এরকমই এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর গ্রাম থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে আঁকাবাঁকা কাঁসাই (কংসাবতী) নদীর তীরে পাথরা গ্রামের ধ্বংস হতে বসা বিরল সৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে রক্ষার জন্য তিনি এগিয়ে এসেছিলেন যুবক বয়সে। সে ছিল সত্তরের দশক। পাথরা গ্রামে দুশো বছরেরও আগে জমিদারদের আমলে গড়ে ওঠা মন্দিরগুলি থেকে দুষ্কৃতিরা খুলে নিয়ে যাচ্ছিল বহুমূল্য প্রাচীন ইট, দামি পাথরের ব্লক, টেরাকোটার মূল্যবান কাজগুলি। কিছু কিছু তার আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সময়ের গ্রাসে। যেগুলি বাকি ছিল তার উপর ছিল একশ্রেণীর মানুষের লোভাতুর দৃষ্টি। রাতের অন্ধকারে তো বটেই দিনের আলোতেও লুঠ করতে ভয় ছিলনা তাদের। কারণ কেউ ফিরে তাকায়নি সেদিকে। কোন প্রতিরোধ ছিলনা। নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পুরনো স্থাপত্যশৈলী। বদলে যাচ্ছিল পাথরার ইতিহাস।

 

তখন একা এগিয়ে আসেন কৃষক পরিবারের সেই সন্তান। মহঃ ইয়াসিন পাঠান। কুড়ি বছর বয়সেই বিখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ তারাপদ সাঁতরাত সান্নিধ্যে এসে যিনি উৎসাহ পান পুরাকীর্তি ও তার সংরক্ষণ বিষয়ে। ধ্বংস-প্রায় মন্দিরগুলির সংরক্ষণ এবং সেখানকার পুরাকীর্তির ইতিহাসের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন। তখন প্রকৃতি এবং মানুষের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে অনেকগুলি মন্দির। অবশিষ্ট ছিল মাত্র ৩৪টি। তাদের অনেকগুলি থেকে খুবলে নেওয়া হয়েছে ইট, টেরাকোটার প্লেট। রক্ষা করার জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোন দিক থেকেই কোন উদ্যোগ ছিলনা। মহঃ ইয়াসিন পাঠান সেগুলি বাঁচাতে লুঠেরাদের সামনে শক্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ান। ইতিমধ্যে তিনি চাকরি পেয়েছেন স্থানীয় স্কুলে অশিক্ষক কর্মচারী হিসাবে। এরপর নিজের সম্পাদনায় শুরু করলেন গ্রামবার্তানামে একটি পত্রিকা প্রকাশ। সেটা ১৯৭৬ সাল। মন্দিরময় পাথরার প্রাচীন পুরাকীর্তিগুলির কথা যত্ন নিয়ে প্রচার করতে লাগলেন সেই পত্রিকায়। লাগাতার প্রচারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বুঝেছিলেন যে শুধু ভালো কথায় কেউ কান দেবেনা। তাই গ্রামের আরও কয়েকজন সমমনস্ক তরুণ যুবককে সঙ্গে নিয়ে ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু করলেন প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ। ব্যবস্থা করলেন পাহারার। সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষকে সংগঠিত করে গড়ে তুললেন পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটি১৯৯১ সালে। শুরু হল আরও কঠিন লড়াই, যা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসাবে আজও তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর স্বপ্ন পুরোপুরি সফল করার উদ্দেশ্যে।

 

 

শুরু করেছিলেন একাই। পরে পথে পেয়েছিলেন অনেককে। কিন্তু তাও সেটা ছিল খুব কঠিন লড়াই। পত্রিকা চালাতে গিয়ে, আন্দোলন জারি রাখতে গিয়ে খরচা করে ফেলেছেন নিজের মাইনের টাকা। অবহেলিত হয়েছে নিজের সংসার। এলাকার প্রতিটি মানুষের কাছে গেছেন, বিভিন্ন দপ্তরে আর্জি রেখেছেন। অনেকের সহযোগিতাও পেয়েছেন। আবার পেরতে হয়েছে অসহযোগিতার অনেক পাহাড়ও। সহ্য করতে হয়েছে অনেক নিগ্রহ, বিদ্রূপ। যেন তাঁর কাজটা বড় অসামাজিক, বড় বিধর্মীয়। নিজে মুসলিম যুবক, অথচ রক্ষা করছেন হিন্দুদের ধ্বংস হতে থাকা মন্দির, এ কেমন কথা! তিনি কিন্তু হাল ছাড়েননি। অসুস্থ শরীর নিয়ে, সংসারের নিত্য অভাব নিয়ে, সংস্কৃতি ঐতিহ্য আর পুরাকীর্তির প্রতি ভালোবাসা আর নিজের অপ্রতিরোধ্য জেদ সম্বল করে কাজ করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত সাফল্য এসেছে। তাঁরই প্রচেষ্টায় স্থানটি পেয়েছে হেরিটেজের তকমা। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া ২০০৩ সালের ১৬ই জুলাই অধিগ্রহণ করে নেন ঐতিহাসিক পাথরার ৩৪টি অবশিষ্ট মন্দির এবং ২৫ একর জমি। শুরু হয় প্রথম পর্যায়ে কিছু মন্দিরে সংস্কারের কাজ।

 

মন্দিরময় পাথরা হয়ে উঠবে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। তৈরি হবে ওয়াচ টাওয়ার, পার্ক। কংসাবতীর কোলে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভূখণ্ডটি সেজে উঠবে নতুন সাজে আর চাঙ্গা হবে এলাকার অর্থনীতি, এই আশায় আছেন তাঁর মত এলাকার সবাই। তবু সহজে তো সবকিছু হয়না। জমিজটে আটকে ছিল পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার কাজ। মহঃ ইয়াসিন পাঠান এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত যে সে জট কেটে গেছে।

 

জীবন বিপন্ন করে, সাম্প্রদায়িক  সম্প্রীতি আর ঐক্য রক্ষা করেছেন, পুরাতত্ত্ব রক্ষা্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এসবের স্বীকৃতি পেয়েছেন অনেক। রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত কবীর সম্মানপেয়েছেন ১৯৯৪ সালে। ২০০৯ এ ২৪ ঘণ্টা অনন্য সম্মান”, ২০১০ এ সোনি এন্টারটেইনমেন্ট টেলিভিশনের দেওয়া “CID গ্যালান্ট্রি সম্মান”, ২০১১ তে সালাম বেঙ্গলসম্মান।মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্তনামে নিজের একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন ১৯৯৩ এ। সেটির পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রকাশ করেছেন ২০০৩ সালে। “ARCHAEOLOGICAL LIST & MAP of DISTRICT PASCHIM MEDINIPUR” নামে তাঁর আর একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৭ এ। গ্রন্থটিতে আছে পশ্চিম মেদিনীপুরের ১০৬১ টি পুরাকীর্তির তালিকা আর তার মানচিত্র যা আগ্রহীদের খুবই কাজে লাগবে। তাঁর জীবন এবং পুরাকীর্তি রক্ষায় তাঁর অবদানের উপর তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্র। ইংরাজি তথ্যচিত্র “ROMANCING THE STONE” (প্রস্তরপ্রণয়) তৈরি করেছিলেন রিপন কমিউনিকেশননামে এক সংস্থা ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালে ভারত সরকারের সংস্থা ফিল্মস ডিভিশনতৈরি করে কাণ্ডারিনামে একটি শর্ট ফিল্ম। কিন্তু এত সম্বর্ধনা, সম্মান পাওয়া সত্তেও তিনি বাস্তবিকই হতাশ। এইসবে তো অভাব মেটেনা। দারিদ্র তাঁর পিছু ছাড়েনি। অবসর নেওয়ার পর শরীরও তেমন সুস্থ নয়। অসুস্থ শরীরেও কিছুদিন আগে দিল্লী গিয়ে তদ্বির করে এসেছেন এ এস আই এর অফিসে পাথরার বাকি কাজ দ্রুত রূপায়নের জন্য। দিন কাটছে একটা অসহায় অবস্থার মধ্য দিয়ে।

 

পঁয়তাল্লিশ বছরের লড়াইয়ের পর এক এক সময় অভিমান আসে - এসব না করাই হয়তো ভালো ছিল। নিজের স্বল্প উপার্জনের অনেকটাই এতবছর খরচ করেছেন পুরাতত্ত্ব গবেষণা আর সংরক্ষণের নেশায়। নিজের পরিবারের দিকেও সেভাবে নজর দিতে পারেননি, সেটাই বোধ হয় ভুল ছিল, মাঝে মাঝে মনে করেন তিনি। কেননা কথা দিয়েও কথা রাখেন না অনেকেই। নানান নিয়ম নীতি আর লাল ফিতের ফাঁসে এখনো আটকে আছে অনেকটাই। তবু মন্দিরময় পাথরা অবশিষ্ট ৩৪টি মন্দিরের পুরোপুরি সংস্কারের পর নতুন করে সেজে উঠবে, বহমান কাঁসাইয়ের তীরে শিল্প ও ঐতিহ্যের সঙ্গমে এসে ইতিহাসকে খুঁজে পাবে মানুষ, এই আশায় এখনও তদ্বির, ছোটাছুটি চালিয়ে যাচ্ছেন ভগ্ন শরীরে। সেই স্বপ্নটি এখনও তাঁর চোখে অমলিন।

Comments

Popular posts from this blog