আমরা সবাই প্রজা
-তারাশংকর
বন্দ্যোপাধ্যায়
আমরা সবাই প্রজা আমাদের এই...- ক্ষমা করুন রবীন্দ্রনাথ। আপনি যে অর্থে রাজা বলেছিলেন সেইরকম
রাজা বলে আর মানতে পারলামনা নিজেদের। সত্যি সত্যিই তো আর আমরা
রাজা নই। রাজতন্ত্রও নেই আমাদের দেশে। তবু কেউ কেউ নিজেদের রাজা রাণী ভাবতেই
পারেন। সে অন্য কথা। সেই একেবারে ছোটবেলাতেই শুনেছিলাম
পিতামহীর মুখে – ‘পেজারা এসেছে গরুর গাড়িতে করে ফসলের ভাগ নিয়ে’। তার মানে আমাদেরও প্রজা আছে? আমরা তাহলে রাজার
মতো? আসলে দূর গাঁয়ের কিছু চাষি যাদের উপর সেই অঞ্চলের কিছু জমিজমার
একটা বন্দোবস্ত করা ছিল দীর্ঘদিন আগে থেকে, তারা বছরে একবার করে
কিছু কিছু জমির ফসল নিয়ে আসত। আর রাজতন্ত্রের ছায়া তো সহজে
সরেনা, তাই নিজেরা রাজা হই আর না হই, যারা বরাবরের জন্য আমাদের
কিছু জমির সত্ত্ব ভোগ করে আসছে, তাদের প্রজা বলে ভাবতে আনন্দের
ঘাটতি ছিলনা কিছু। অবশ্য পিতামহীর সঙ্গে সঙ্গে
সেইসব চলে গেছে চিরতরে।
তার পরপরই সেই শৈশবেই শোনা সেই গান - আমরা সবাই রাজা
আমাদের এই রাজার রাজত্বে। কি স্বত্বে যে আমরা সেই রাজার
সঙ্গে মিলব আমরা নিজেরাই জানিনা। কি সেই অধিকার, কতটুকু অর্জন করলে
তবে মেলা যায়, সমানে সমানে হওয়া যায় সেই ধারণাটাই তৈরি হয়নি আমাদের
মনে। হয়তো যোগ্যতাই হয়নি আমাদের। সেকারণে কিনা জানিনা – রাজা যদি কেউ
থেকেও থাকে মনে মনে, তার সঙ্গে রাজা হওয়া হয়নি আমাদের।
কিন্তু আমাদের প্রজাতন্ত্র আছে। আক্ষরিক অর্থে রাজার সঙ্গে সম্পর্কের
প্রান্তে থাকা প্রজার মত নয়। সেখানে আমরা সবাই প্রজা। বাল্যে শোনা পিতামহীর সেই ‘পেজাদের’
সঙ্গে আমরা সবাই এক আসনে। প্রজাতন্ত্রে সবকিছু সবার জন্য সমান। অধিকার, ন্যায়বিচার, সাম্য, স্বাধীনতা, সংহতি, পরস্পরের মধ্যে
ভ্রাতৃত্ববোধ এইসবগুলি সবই সবার জন্য সমান গুরুত্বে স্বীকৃত সেখানে। আর এইসব কিছু উদযাপনের জন্য আমাদের
প্রজাতন্ত্র দিবস আছে। ছাব্বিশে জানুয়ারি আছে।
এই থাকাটাকে ঘিরে যা যা চোখে পড়ে
সেখানেই জেগে ওঠে অবাধ্য কিছু প্রশ্ন। সবকিছুর মধ্যে যেভাবে থাকার কথা ছিল সেভাবে তো প্রজাদের কথা
নেই। কথা ছিল সবাই অন্তত পেট ভরে খেতে
পাবে, সম্মানের সঙ্গে নিজের অধিকারে বাঁচতে পারবে। নিজের সুখ দুঃখ ব্যথা বেদনা অভাব অভিযোগের কথা মন খুলে বলতে
পারবে, প্রতিকার চাইতে পারবে। সেই চাওয়াটা হবে – আমি কারও চেয়ে ছোট নই, সবার সঙ্গে আমারও অধিকার রাষ্ট্রের কাছে সমান – এই বোধ
থেকে। কিন্তু কি দেখি প্রায়শই খালি চোখে? দেখি সেসব অঙ্গীকার
আর অধিকার সার্বিক ভাবে সত্য হয়ে ওঠেনি তো। চরম এক অসত্য বিরাজ করছে চরাচর জুড়ে। সেই অসত্য হলো দারিদ্র, অশিক্ষা, শাসক
ও শাসিতের মধ্যে দূরত্ব। স্বাধীনতা-হীনতা। প্রজাতন্ত্রে যেকোনো নাগরিক কি যেকোনো
নাগরিকের সঙ্গে সমান? অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বাদ দিলেও রাজনৈতিক আর সামাজিক দিক
থেকে? তাহলে রাজনীতি এত ঘোলাটে কেন? যাদের
হাতে ক্ষমতা তাদের এত দাপট কেন?
এই অবাধ্য প্রশ্নটাই ভাবায় – কেন এত দাপট?
যাদের হাতে দেওয়া হল দেশ চালাবার রাজনৈতিক দায়িত্ব, নাগরিকের সুখ দুঃখ ভালো মন্দ প্রয়োজন অপ্রয়োজন বিবেচনা করে তাদেরই অর্থে তাদের
জন্য কিছু নাগরিক সুযোগ সুবিধা রুজি রোজগারের সুযোগ করে দেওয়ার ভার, তারা তো বিনীত হবে, প্রথমে সেবক হবে। অথচ ভোট চাওয়ার সময়টুকু ছাড়া বাকি
সমস্ত সময় জুড়ে শুধু দাপট আর শাসকের গাম্ভীর্য। প্রতিপদে বুঝিয়ে দেওয়া তোমরা আমার মত নও, আমি তোমাদের থেকে
একেবারেই আলাদা, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, আমাকে
গুরুত্ব দাও, আমি সাধারণ কেউ নই। জনপ্রতিনিধি শব্দটির ষোলোআনা উলটো অর্থ করে তাদের অনেকেই মনে
করে আমি যা বলবো তাই হবে। আমি তোমাদের শাসক। আসলে দেশটা যে জনসাধারণের, সব সম্পত্তিই সাধারণের,
সবারই সমান অধিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য, এটা বেশিরভাগই
নেতাদের কথায়, কাজে, বিশ্বাসে, আচরণে, কোথাও নেই। তাই বেড়ে ওঠে দুর্নীতির পাহাড়। রাজনীতির নতুন নতুন ঘূর্ণি। ভাইয়ে ভাইয়ে ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় অশান্তি হুমকি এমনকি খুনোখুনি। বেনিয়মে বিক্রি হয়ে যায় নদীর বালি
থেকে পাহাড়ের পাথর। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যায়
মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের ঘরবাড়ি, জীবনযাপন। সম্পদ চলে যায় একশ্রেণীর হাতে। গরীব আরও গরীব হয়। কোথায় পড়ে থাকে প্রজাতন্ত্র, সমানাধিকার। অন্যদিকে যারা ফুলে-ফেঁপে ওঠে তারাই হয়ে
ওঠে সমানের মধ্যে বেশি সমান।
আর প্রজাদের হাতে থাকে শুধু ছাব্বিশে
জানুয়ারি। রাজপথে ট্যাবলো। নির্ভেজাল একটা ছুটির দিন। শীতের মোলায়েম রোদ্দুর মেখে কাছাকাছি
পিকনিক। দারিদ্রসীমার লম্বা দড়ি। যদিও প্রান্ত-জনের মধ্যে সেসবের
কোন ধারণাই নেই সেভাবে। তারা জানেনা কোনটা কি আর
কেন। তারা জানেনা কারও মনের কথায় তারা
আছে কিনা। তাদের কাছে কোন অপশন নেই। তারা জানে সীমাহীন দারিদ্র আর কষ্টভোগ। তারা জানে ডোল আর অনুদানেই তাদের
শ্রী বৃদ্ধি। উৎসব মেলা আর মিটিংযেই তাদের মুক্তি। প্রতিদিনের জীবনযাপনে তারা সাম্য
স্বাধীনতা স্বার্থ নিরাপত্তা অধিকার কর্তব্য মানবাধিকার মুক্ত মতপ্রকাশ ও জীবনচর্যা
ইত্যাদি বিষয়ে কতটা ওয়াকিবহাল তা সহজেই অনুমেয়। সেই শিক্ষা বা চেতনা তাদের দেবার কথা কেউ ভাবেনি। তাদের কথা এখনও সেভাবে কেউ শোনেনা। কিন্তু সাধারণ প্রজারা এটুকু হয়তো
বোঝেন – নিজেকে রাজারাণীর মত না ভেবে প্রজাদের মত ভাবলে, প্রকৃত প্রজাতন্ত্রের পূজারী
হতে চাইলে, মনেপ্রাণে মানুষের বিকাশ চাইলে তাঁকে প্রজাদের কথা
শুনতে হবে।
-----
Comments
Post a Comment