গাজন : প্রান্তজনের প্রাণের উৎসব না কি
মর্মবেদনার প্রকাশ
-তারাশংকর
বন্দ্যোপাধ্যায়
বসন্ত যাবো
যাবো করেও সবটা চলে যায়নি। কখন কোথা থেকে ভেসে আসছে কোকিলের ডাক সেটা বুঝে নিতে
গেলেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে গ্রীষ্মের চোখরাঙ্গানি্র। গাছে গাছে ঝুলছে কচি আমের থোকা। কোথাও বা
কখনো কানে এসে যায় ঢাকের আওয়াজ। রাঢ় বাংলা্র অনেক জায়গাতেই এরকম আবহটি জানিয়ে দেয়
গাজন এসে গেছে।
আবহমান কাল ধরে রাঢ় বাংলার
লোকসমাজে চলে আসা গাজন মানেই শিবের গাজন বা ধর্মঠাকুরের গাজন। আর তা উদযাপনের
সময়কাল চৈত্র থেকে আষাঢ় মাসের যেকোন সংক্রান্তি বা পূর্ণিমা পর্যন্ত। তবে শিবের
গাজন বা চড়ক চৈত্র সংক্রান্তির সময়ই অনুষ্ঠিত হয়। শিবের উপাসকরাই এই গাজনের হোতা।
অন্যত্র ধর্মরাজের গাজনের আড়ম্বরেও কিছু ঘাটতি থাকেনা। গাজন আসলে একটি লৌকিক
অনুষ্ঠান। কোন কোন মতে যদিও চৈত্র সংক্রান্তির গাজন বা চড়কের সঙ্গে শিবের তেমন কোন
যোগ নেই, ছিলওনা কোনোদিন। এমনকি লিঙ্গপুরাণ,
বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে চৈত্র মাসে শিবের আরাধনা এবং সেই উপলক্ষে নাচ গান ইত্যাদি সহ
উৎসবের উল্লেখ থাকলেও চড়কের উল্লেখ নেই। আর একটি মতে
চড়কের অনুষ্ঠানে চড়ক গাছ থেকে চক্রাকারে ঘোরার যে ধারা তার সঙ্গেও শিবের
কোন সম্পর্ক নেই। ঐ সময় সূর্য দ্বাদশ রাশির যাত্রা শেষ করে নতুন যাত্রার জন্য
প্রস্তুত হয়। ফলে তখন সূর্য পূজার তিথি হতে পারে। শিব পুজোর নয়। হতে পারে শৈব
ধর্মের প্রভাবই ঐ সময় সূর্য বা ধর্মরাজের গাজনকে শিবের গাজন বলে প্রচার করেছে। তাই ধরে নেওয়া হয়
গাজন শুধু মাত্র একটি বসন্তকালীন উৎসব।
বাঙ্গালির বর্ষ বিদায়ের উৎসব। সঙ্গে সঙ্গে নতুনকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। চক্রাকারে
ঘুরতে থাকা ঋতুগুলির মধ্যে একটি থেকে নতুন বছরের আর একটি ঋতুতে বেয়ে যাওয়া। সেটি
ঘটে যাচ্ছে সংক্রান্তির সময়েই। সংক্রান্তি, বা ক্রান্তির সঞ্চার। এক ক্রান্তি বা
কিনারা থেকে আর এক কিনারার দিকে যাত্রা।
তবু অনুষঙ্গ গুলি এড়িয়ে যাওয়ার
নয়। নীল পুজো যেমন। লোককথা অনুযায়ী ঐদিন শিবের সঙ্গে
নীলচণ্ডিকা বা নীলের বিয়ে হয়।
অনেকের বিশ্বাস এটি দেবী হরকালীর সঙ্গে শিবের বিয়ের অনুষ্ঠান। সেই উপলক্ষে শিবের অনুগত সন্ন্যাসীরা বরযাত্রী হিসেবে
অংশ নেন। তাদের আনন্দ উল্লাস গর্জনের মত শোনায়। পরবর্তী কালে শিবের উপাসকরা সেই
ক্ষণটিকে স্মরণীয় করে রাখতে শিবের গাজনের সূচনা করে। আরও একটি অনুরূপ বিশ্বাস,
ধর্মরাজের গাজনের উদ্ভবও ধর্মরাজের সঙ্গে দেবী মুক্তির বিয়ের উৎসবেরই উদযাপন। উদ্দিষ্ট
দেবতার উদ্দেশ্যে ভক্তদের নিবেদনই উৎসবের শেষ কথা।
কোথাও একদিন বা দুদিন, কোথাও বা
চার পাঁচদিন ধরে চলে উৎসব। বীরভূম, বর্দ্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ
অঞ্চলই গাজনের আয়োজক। বর্ধমানের কয়েকটি জায়গার গাজন তো রীতিমত বিখ্যাত। বাঁকুড়ার
বড়জোড়া, মালিয়াড়া, বেলিয়াতোড়, দধিমুখা, জগন্নাথপুর, পাঁচাল, এক্তেশ্বরের গাজন ভীষণ
সমাদৃত। কোথাও শিবের তো কোথাও ধর্মরাজের বা চণ্ডীর গাজন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে
শিবের গাজনই চলে আসছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। তুলনায় ধর্মের গাজন অতটা প্রাচীন
নয়। কিন্তু সব গাজনেই উৎসাহ উদ্দীপনার অন্ত নেই, সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা
করে থাকেন। বাড়ির প্রবাসী সদস্যেরা তো বটেই, আত্মীয় কুটুম্বরাও আসেন গাজন উপলক্ষে।
চলে মেলা, সেখানে নানান আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন। প্রসঙ্গত বলা যায় বাঁকুড়ার জগন্নাথপুরের
রাত গাজনের মেলায় মানুষের যে স্বতঃস্ফুর্ত সমাগম, তা যে কোন বড় বিখ্যাত মেলার
সমান। কয়েকদিন ধরেই চলে এই মেলা। অনেক জায়গাতেই বিভিন্ন উপলক্ষে মেলা বসে। কিন্তু
জগন্নাথপুরের গাজনে রাতগাজনের দিন সারা রাত্তির ধরে চলতে থাকা এরকম মেলা বড় একটা
দেখা যায়না। সেই মেলায় খেটে খাওয়া দিনমজুর
থেকে সমাজের সকল স্তরের মানুষের উজ্জ্বল উপস্থিতি। মেলার অন্যতম আকর্ষণ অন্যান্য
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সারা রাত্তির ধরে চলা বাণফোঁড়া আর ঢাকের বাজনার সঙ্গে
নাচ। রাতগাজনে বাণফোঁড়া পার্শ্ববর্তী গ্রাম দধিমুখাতেও হয় এবং চলে ভোরবেলা
পর্যন্ত, কিন্তু সেখানে মেলা হয়না। দধিমুখার মেলাটি হয় চড়কের দিন বিকেলে। সেও এক
মহা মিলনক্ষেত্র। এইরকম চড়ক ঘোরাও খুব কম স্থানেই হয়ে থাকে।
গাজন উৎসবের উৎস নিয়ে সঠিক তেমন
তথ্য না থাকলেও প্রচলিত বিশ্বাস এই যে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের, আর্য সংস্কৃতির সঙ্গে অনার্য সংস্কৃতির সংঘাত আর সমন্বয়ের
মধ্যে থেকেই উদ্ভব হয়েছে গাজনের। উচ্চবর্ণের লোকেরা এই উৎসবে সেভাবে অংশগ্রহণ
করেনি। অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষগুলিই এর মূল অংশগ্রহণকারী। কৃচ্ছসাধন, শরীরকে তুচ্ছ
জ্ঞান করে চূড়ান্ত আত্মনিগ্রহ তারাই করে আসছে প্রাচীন কাল থেকে। সমাজের সকল
শ্রেণীর মানুষ সেই উৎসব উপভোগ করে মাত্র। ‘দণ্ডসেবা’, ‘আগুন সন্ন্যাসী’, বাণফোঁড়া, উপোষ থাকা, বিশেষ আংটার মত বাণ ফুঁড়ে চড়ক ঘোরা এইসব দৈহিক
অত্যাচারগুলি সহ্য করে সেইসব প্রান্তিক মানুষ গুলিই। হাঁড়ি, বাগদি, বাউরি, ডোম,
মুচি, লোহার প্রভৃতি শ্রেণী থেকেই উঠে আসে অংশগ্রহণকারীরা। স্বেচ্ছায় আসে তারা। পিছনে কাজ করে এক
ধর্মবিশ্বা্স। যেভাবেই হোক শিবকে বা ধর্মরাজকে সন্তুষ্ট করা। তাঁর আশীর্বাদ পাওয়া।
অন্য এক যুক্তি বলে এই সময় সূর্যের যে প্রখর তেজ চলতে থাকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত,
উত্তপ্ত মাটি আর হাওয়ার খরতাপে দগ্ধ হতে থাকে চারপাশ, তা থেকে মুক্তি পেতে,
বৃষ্টিধারায় ভিজিয়ে দিয়ে পৃথিবীকে দ্রুত কৃষিকাজের উপযুক্ত করে তুলতে এই প্রার্থনার
আয়োজন। তাই এই উৎসব।
উৎস বা কারণ যাই হোক, প্রশ্নটা
থেকেই যায়। এত কৃচ্ছসাধন কেন? কেন নিজের শরীরের উপর এরকম নিপীড়ন? এ কি নিছক
ধর্মাচরণ, নাকি আরও অন্য কিছু? যদি ধর্মাচরণই হয় এবং পুণ্য অর্জনের পথই হয় তাহলেও
তা এত নিষ্ঠুর কেন! সমাজের অন্য শ্রেণীর মানুষের মধ্যেও এর প্রচলন নেই কেন? তাদের
শরীর এবং মন এই আত্মনিগ্রহ সহ্য করার উপযুক্ত নয় বলে? অনেকগুলি কেন উঠে আসে গাজনের
অনুষঙ্গে। গাজন তো একদিনের নয়। কোথাও দু তিন দিন, কোথাও বা চার পাঁচ দিনের উৎসব।
চৈত্রের শেষ তিনদিনের অনুষ্ঠান হল দিনগাজন, রাতগাজন আর চড়ক সংক্রান্তি। যারা ভক্ত
হয় তারাই আসল হোতা। ভক্তরা গাজনের সময় পক্ষকাল ব্যাপী গলায় পৈতে পরার অধিকার পায়।
তখন তারা শিবগোত্রের মানুষ হয়ে যায়। আবার গাজন শেষে পৈতে বিসর্জন দিয়ে যে কে সেই
অবহেলিত জীবন। তাদের মধ্যে একজনকে মাথায় নিতে হয় “পাট”, যেটি বিশেষ ভাবে কাঠের পাটা
থেকে তৈরি, মানুষ সমান লম্বা। ডিজাইনটি দেখার মত। গায়ে উলটো করে বসানো অনেকগুলি
পেরেক। সে কি শরশয্যার রূপক? সারা পাট টিতে তেল সিঁদুর মাখানো। পাটভক্তর
মাথায় করে পাট নিয়ে যাওয়া কি কোন এক মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাওয়ার প্রতীক? সে কি
ব্রাম্মণ্যবাদ বা সমাজে চলে আসা রক্তমুখি অত্যাচারগুলিকে অনার্য সভ্যতার উত্থানের
পর “মৃত” মনে করে দেবতার মহিমা আরোপ? মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত শিবের নামেই সেই পাটের
নাম। যেমন ‘গঙ্গাধর’, ‘রত্নেশ্বর’, ‘এক্তেশ্বর’ ইত্যাদি। রাতগাজনের দিন বিকেলবেলা
গ্রামের নির্দিষ্ট কিছু বাড়িতে ভক্তরা নিয়ে যায় পাটকে। পুজো হয় সেখানে। ফুল মালা
নৈবেদ্যর সঙ্গে পেরেকে গেঁথে দেওয়া হয় নানান ফল আর অবশ্যই বোঁটাসুদ্ধ কাঁচা আম। ভক্তদের
হাতে থাকে একটি করে বেতের ছড়ি। মাঝে মাঝেই
তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে উপাস্য দেবতার নামে ধ্বনি। হাতের বেতগুলি আওয়াজ করে
ওঠে। বেজে ওঠে ঢাক। গাজনের সবকটি দিন ধরেই চলে তাদের কৃচ্ছসাধন। নিরম্বু উপবাস।
হবিষ্যি। দিনগাজনের দিন দুপুরের প্রখর রোদ্রে চলে ঢাকের তালে তালে নাচ, সারাদিন
উপোষ থেকেও। সন্ধ্যায় আবার ‘আগুন সন্ন্যাসী। উপরের দিকে পা আর নিচের দিকে মাথা রেখে পেন্ডুলামের
মত দুলতে দুলতে আগুনে আহুতি দেওয়া। পরদিন শরীরের বিভিন্ন বিন্দুতে ফোঁড়া দশটি বাণ
দিয়ে শুরু হয় রাতগাজন, যার নাম “দশমুখী” বাণ। দেখে অনেকেরই গা শিউরে ওঠে। তারপর চলতে থাকে হাত, পেট, জিব, ঠোঁট সহ শরীরের
নানান জায়গায় বাণ ফোঁড়া আর নাচ। লোহার সরু রডের মুখগুলি সূচলো
করে তৈরি হয় এই বাণ। একটি বাণ একাধিক ভক্তও ফুঁড়ে নাচতে থাকে। ভক্তর
সংখ্যা এবং বাণ ফুঁড়তে উৎসাহীর সংখ্যা যেখানে যত বেশি, তত বেশি সময় ধরে রাতগাজন।
কোথাও সারারাত্তির ধরে চলে এই বাণফোঁড়া আর নাচ। আর একটি বিশেষ বাণ ফোঁড়া হয়, তার
নাম বাঁশবাণ। একটি বাঁশের ডগার দিকটি সরু করে চিরে ছাতার মত অনেকগুলি ফালি তৈরি
করে নেওয়া হয়। সেগুলিই ফুঁড়ে নেয় অনেকে মিলে, আর ঢাকের সঙ্গে নাচতে থাকে। এরাই
আবার সংক্রান্তির দিন চড়কের সময় পিঠে বঁড়শীর মত বাণ ফুঁড়ে
দড়িতে ঝুলে চড়ক ঘোরে। জমজমাট হয়ে ওঠে চড়কের মেলা। আনন্দ লুটে নেয়
দূর দূরান্ত থেকে আসা মানুষজন। ঢাকের শব্দে, শিশুদের হাতের বেলুন আর বাঁশির আওয়াজে
আর মেলা্র কোলাহলে চাপা পড়ে যায় ‘ভক্ত’ দের সমস্ত কষ্ট। সে দিকটা অবহেলিত থেকে
যায়। যেন এটাই তো স্বাভাবিক। এরকমই তো হয়ে আসছে আজন্মকাল।
এগুলো তো কম কষ্টের নয়! উপোষী শরীরে বাণ
ফোঁড়া, পিঠের চামড়ায় চড়কের বাণটি ফুঁড়ে দড়ির সঙ্গে আটকে চড়কে ঘোরা, এসব তো কম
যন্ত্রণার নয়! এত উদ্দীপনা কি করে আসে ভক্তদের? এত মনের জোর! দৈনন্দিন জীবনে তারাও একটু আরামের মধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে
চায়না তা তো নয়। কষ্টসাধ্য কোন কাজ করার সময় যে একটু মন বিদ্রোহ করেনা তাও নয়।
তাহলে গাজনে বাণ ফোঁড়ার সময় তার উল্টোটা হয় কেন? নিষেধ করলেও
শুনতে না চাওয়া, মান অভিমান করা, কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিটিকে
বুঝিয়ে বা জেদ করে যেভাবেই হোক বাণ ফুঁড়িয়ে নেওয়া, চড়কে ঘোরা
এসব অত্যন্ত কষ্টকর প্রয়াস কি ধর্মাচরণের পাশাপাশি নিছক উপাস্য দেবতার কাছে নিজের
যন্ত্রণাকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেওয়া? ব্যথা বেদনার জাগতিক বোধকে হাসিমুখে তুচ্ছ করার
দার্শনিক প্রকাশ কি এগুলি? হয়তো তাই। হয়তো তার সঙ্গে সাহস, যন্ত্রণা সহ্য করার
শক্তির প্রদর্শন। আবার তার সঙ্গে সেইসময় চলতে থাকা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র
প্রতিবাদ। যে ব্রাহ্মণ্যবাদ ধর্মরাজকে নিজেদের দেবতা বলে মেনে নেয়নি। শিবকেও
প্রথমদিকে মান্যতা দেয়নি। শ্মশানে ছাইভস্ম মেখে ঘুরে বেড়ানো এলেবেলে কোন
নেশাসক্তকে আর যাই হোক দেবতার মর্যাদা দেওয়া যায়না। কিন্তু সাধারণের মধ্যে শিবের
প্রভাব অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই শেষ পর্যন্ত জনগণেশ যার পাশে, সেই দেবতা স্বীকৃতি
পেয়ে যান, তবে একেবারে শেষ আসনে। ব্রহ্মা বিষ্ণুর পরই তিনি মহেশ্বর।
চড়কে যখন তারা ঘুরতে থাকে তখন
যেন তারা মুক্ত বিহঙ্গ। আরও ঘুরতে চায়, আরও উড়তে চাওয়ার আকুতি। তখন তাদের পিঠের
চামড়ায় ফোঁড়া যন্ত্রণাদায়ক বঁড়শী। ঝুলতে থাকা শরীরের ভারে তা পেঁচানো গামছার বাঁধনকেও অগ্রাহ্য করে পিঠের চামড়াকে
ছিঁড়ে দিতে পারে যে কোন সময়। ছিঁড়ে যায়ও কখনো কখনও। তবু ওই অবস্থায় আরও ঘুরতে
চাওয়ার মধ্যে যেন তারা এটাই জানিয়ে দিতে চায়, এটুকুই তাদের মুক্তি। এটুকুই তাদের
নিজের আনন্দের পৃথিবী। এ যেন চিরকাল অবদমিত থাকার এক প্রচলিত প্রথার প্রতি এক
মুক্ত বিদ্রোহ। না কি এর মধ্যে থেকেই তারা খুঁজে নিতে চায় জীবন সংগ্রামের প্রেরণা!
সারাবছর ধরে পুকুরের জলে ডুবিয়ে রেখে চড়কের দিন সেগুলি তুলে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে
তবে সেগুলি পোঁতা হয়। অত্যন্ত শক্তপোক্ত যুগ যুগ ধরে অক্ষত থাকা ঋজু গাছগুলি যেন
তাদের দৃঢ় জীবনবোধ যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় দৈনন্দিন বেঁচে থাকা। তাই তাতে একবার ঘুরে
নেওয়ার এত আর্তি!
বাণফোঁড়ার পুরো প্রক্রিয়াটির
প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক লেখক ডঃ স্বপন ঠাকুর ও আঁখি বন্দ্যোপাধ্যায় এক অন্য দার্শনিক
দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান দিয়েছেন। তাঁদের মতে শিকারে সাফল্যের জন্যই বাণফোঁড়া প্রথাটির
উদ্ভব। ৯ই এপ্রিল “এই সময়” কাগজটিতে গাজন
বিষয়ে তাঁদের লেখাটির কিছু অংশ তুলে দেওয়া যেতে পারে। “প্রকৃতপক্ষে শিকারকার্যে
সাফল্যলাভ করার জন্য বাণ ফুঁড়ে পশুপতিকে প্রসন্ন করা থেকেই প্রথাটির উদ্ভব। শৈবদের
চোখে মানুষ মাত্রেই জৈবিক কামনা বাসনার বাণবিদ্ধ পশু। স্বয়ং শিব ভক্তদের পশুভাব
দূর করেন বলেই তিনি পশুপতি। এই দার্শনিক ধারণাটির জন্ম বাণ মেরে পশু শিকারের বাস্তবতা থেকে। পশু শিকার
করার জন্যই পশুপতিকে প্রীত করত শিকারিরা। শিবগাজনে বাণফোঁড়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে
সেই আদিম শিকার-জীবনের ধূসর স্মৃতি”।
আবার অনেকের মতে এটি আসলে একটি রূপক।
বৌদ্ধ ধর্মের সন্ন্যাসীরা,
বিশেষত হীনযান সম্প্রদায় যখন হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করল তাদের তন্ত্র মন্ত্র সমেত আর আর্য সংস্কৃতির সঙ্গে অনার্য সংস্কৃতির যখন মিলন হচ্ছিল
তখন সবটাই স্বাভাবিক ছন্দে হয়েছিল তা নয়। কিছুটা রক্তপাত কিছুটা নির্যাতনের আদান প্রদান আর লড়াই তো ছিলই। এই লোকউৎসব সেটিকেই একটি প্রথা
করে নিয়েছে। তাই হয়তো শুধু আনন্দের উৎসব নয়। কিছুটা জেহাদ বা প্রতিবাদ, সাহস আর মর্মবেদনার
প্রকাশ আর কিছুটা দার্শনিক ভাবনার মিশেল থেকেই হয়তো এই আত্মনির্যাতনের পরম্পরা।
---
Comments
Post a Comment