জয়দেব আর কুমুদকিঙ্করে মজেছিল ফিলাডেলফিয়া্র যুগলও

                                    -তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

 বাউলের আসর আর তাতে মানুষের মজে থাকা দেখতে হলে পৌষ সংক্রান্তির সময় জয়দেব কেন্দুলির মেলায় একবার যেতেই হবে। বাউল শব্দটা শুনলেই তো মনটা কেমন করে ওঠে। বাউল মানেই বাধা-বন্ধনহীন বিশ্বপ্রেমিক। গানের মধ্যেই তাদের নিজস্ব মরমি জগত। বাউল গান তো তাদের কাছে সাধনসঙ্গীত। এমন সহজিয়া সুরে মানুষ মজবেনা তো মজবে কিসে? জয়দেবের মেলা বা কেন্দুলির মেলা মানেই সেই বাউলদের আখড়া, সঙ্গে যদিও থাকে কীর্তনও। রাতভর সেইসব আখড়ায় ঘুরে ঘুরে বাউলগান শোনা আর ইচ্ছে হলেই যেখানে সেখানে বসে পড়ে পাত পেড়ে গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে নেওয়া, বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসী মানুষের স্রোতে ভাসতে ভাসতে সারা রাত মেলায় ঘোরা, এই টানেই হয়তো অনেকেই যান সেখানে। আমি সেই মেলায় প্রথম গেছিলাম তরুণ বয়সে।

 তবে সে আজকের কেন্দুলি নয়। সেই সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। আমি সেই প্রথমবার যাচ্ছি জয়দেব। সঙ্গে দুই বন্ধু চিন্ময় (ঘোষ) আর স্বপন (পাল)। বাউল গান এর আগে যেমন শুনেছি, জয়দেব ও গীতগোবিন্দ বিষয়েও জেনেছি পড়েছি ইতিমধ্যেই। তবু দুর্গাপুর থেকে বেশ কাছেই অজয়ের ওপারে যাওয়া হয়নি তখনো পর্যন্ত। তাই পৌষের শেষে কনকনে ঠাণ্ডায় অজয়ের পারে বাস থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে নদী পেরিয়ে সেই পুণ্যভূমিতে পা রাখার উত্তেজনাটা ছিল একেবারে অন্যরকম। অজয় আসলে নদ হলেও সাধারণের কাছে তো সে নদীই। কোথাও বেরিয়ে আছে বালি, কোথাও বড় জোর হাঁটু সমান জলের মন্থর স্রোত। সেই নদী পেরিয়ে কেন্দুলিতে এসে পৌঁছালেই মনে হয়, আহা, এই তো সেই পুণ্যভূমি কেন্দুবিল্ব। এইখানেই তো কবি জয়দেব লিখেছিলেন গীতগোবিন্দম্‌। তাতে একদিন অলৌকিক ভাবে লেখা হয়ে গেছিল তার একটি পদের অসম্পূর্ণ অংশ – ‘দেহি পদপল্লবমুদারম্‌’।

 ইতিহাস না কিংবদন্তি না বিশ্বাস সে বিতর্কে না গিয়েও মনে তো একটা শিহরন হয়ই। মনকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। কি আশ্চর্য সমর্পণ! কামনায় শরীর যতই বিকারগ্রস্ত হোক, যত ক্ষমতাবানই হোক, গায়ের জোরে প্রেম আদায় করা যায়না। তাই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকেও বিনীত হয়ে রাধাকে বলতে হয়, তোমার পা দুটি আমার মাথার উপর রাখো। আমার বিকার দূর হোক। ভাবি আর কত যে দৃশ্যপট মনের মধ্যে তৈরি হয়। প্রেমের বসতি কি শরীরকে বাদ দিয়ে সম্ভব? বৈষ্ণব সাহিত্যে ছড়িয়ে থাকা এরকম কত পদ যে কি মাত্রায় আধুনিক আর শিক্ষণীয় তা ভাবলে বিস্ময়ের অবধি থাকেনা।

 চারদিক থেকে মাইকে ভেসে আসা আসল আর নকল বাউলের মিলিত কণ্ঠস্বর আর হরেক রকম আওয়াজে কান পাতা দায় হলে কি হবে, কেন্দুলির মেলায় এটাই মুখ্য আকর্ষণ। আমরা গেছিলাম মকর সংক্রান্তির আগের দিন সন্ধ্যায়। পরদিন ভোরে মকরস্নান। কদমখণ্ডী ঘাটে তখন মানুষ আর মানুষ। তার আগে সারারাত্তির না হলেও যতটা সম্ভব ঘুরে মেলা দেখা আর ক্লান্ত হলে বা খুব ঘুম পেলে কোনো আখড়ায় একটু চাদর মুড়ি দিয়ে বসে পড়া – এটাই বেশির ভাগ দর্শনার্থীর অভিলাষ। তার মধ্যে অবশ্যই একবার মন্দিরটিও দর্শন করে নেওয়া চাই। বাইরে টেরাকোটার কাজ আর ভিতরে রাধামাধব দর্শন করেই অনেকের মেলা পরিক্রমা শুরু হয়। এ তো মূলত রাতের মেলা। যত রাত বাড়ে, তত জমে ওঠে। তবে আমরা অতসব না ভেবেই তমালতলা সহ বিভিন্ন দিকে ঘুরতে ঘুরতে এসে একটু জায়গা পেয়ে দাঁড়ালাম মনোহর দাসের আখড়াতে। মনোহর ক্ষ্যাপা নামেই বেশি পরিচিত তিনি। এ এমন এক আখড়া, যা সবাই চেনে, সবাই একবার ঘুরে যায়, যেন মেলার মধ্যে আর এক তীর্থক্ষেত্র। বাউলরাও অন্তত একটি গান গেয়ে যান এই আখড়ায়, তা তিনি গৃহী বাউলই হোন বা সাধক বাউল। যেমন পূর্ণচন্দ্র দাস, গোষ্টগোপাল দাস, বিশ্বনাথ দাস, দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখরা তো আছেনই। এই প্রসঙ্গে দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গানের কথা খুব মনে পড়ে, বিদায় দাও গো শচীমাতা, সন্ন্যাসেতে যাই। তিনি দিলীপ বাঁড়ুজ্জে নামেই বেশি খ্যাত ছিলেন। কেন্দুলির মেলায় যদিও তাঁকে দেখিনি, কিন্তু অন্যত্র কয়েকবার তাঁর গানের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছে। তিনি অনুষ্ঠান শেষ করতেন ওই গানটি দিয়ে। স্টেজে ঘুরে ঘুরে উপর দিকে তাকিয়ে যখন গানটা গাইতেন, তাঁর চোখ থেকে জল ঝরে পড়ত। তার সঙ্গে অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠত সমস্ত দর্শকের চোখও। দর্শকরা ওইরকম আবেগতাড়িত হয়ে পড়তেন খুব কম গানেই।

 আমরা যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পরেই সেই আখড়ায় এলেন পূর্ণদাস বাউল। সঙ্গে কিছু ছাত্রছাত্রী। তাঁকে সেই প্রথম সামনা সামনি দেখা আমার। এর আগে রেডিওতেই তাঁর অনেক গান শুনেছি। দেখার সুযোগ হয়নি কখনও। তাই তাঁর গান না শুনে সেই আখড়া থেকে উঠবোনা এটা ঠিক করেই ফেলেছিলাম। একটু পরেই তিনি গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। প্রথমে দু একটি কথা বলে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন তারা সুদূর আমেরিকা থেকে এসেছে এই মেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য। বেশি গান ওখানে কেউ গান না। তবু স্বনামধন্য পূর্ণ চন্দ্র দাস গাইতে উঠেছেন, আর ‘গোলেমালে গোলেমালে পিরীত করনা’ গানটি থাকবেনা তা হয়না। তাঁর যাদুকণ্ঠে সেই গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তখন সেই আখড়ার দর্শক যেন অন্য সবকিছু ভুলে গেছে।

 সারারাত মেলায় ঘুরবো আর বাউলের আখড়ায় আখড়ায় গান শুনবো এটাই আমাদের প্ল্যান ছিল। শেষ পর্যন্ত কুমুদ দা’র আশ্রয় তো আছেই। তাঁর কথায় পরে আসছি। কি করে যে কখন কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যায়, সব আগে থেকে ভেবে রাখা যায়না। খাওয়ার ব্যাপারেও তাই। অবশ্য জয়দেবের মেলায় খাওয়ার ভাবনা ভাবার দরকারও হয়না। অন্তত তখন হতোনা। প্রায় সমস্ত আখড়াতেই একদিকে গানবাজনা চলছে তো  আর একদিকে খাবারের আয়োজন। বড় বড় কড়াইয়ে খিচুড়িও ফুটছে, অন্যদিকে খাওয়া দাওয়াও চলছে। যে খুশি যে কোনো আখড়ায় গিয়ে পাত পেতে বসে যেতে পারে। সে মানুষের এক মহা মিলনক্ষেত্র। সবাই সমান। সবারই আমন্ত্রণ সেখানে। কেউ একটু বেশি বা একটু কম নয়। এই সত্যিকারের সাম্যের রূপটা সচরাচর কোথাও তেমন দেখা যায়না। সেইটাই আমার কাছে অভিনব মনে হয়েছিল। আমরাও এরকম এক জায়গায় বসে পড়লাম। অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর পর পেটে তখন রাক্ষুসে খিদে। আহা, তীব্র শীতের রাতে উনুন থেকে সদ্য নামানো খিচুড়ি যেন পৃথিবীর সমস্ত অমৃতের থেকে শ্রেয় মনে হলো।

 জয়দেব মেলা তখনো পর্যন্ত মূলত গ্রামীণ মেলা ছিল। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি – এই মেলায় প্রচুর কলা বিক্রি হয়। আসার সময় দেখেছি পাহাড় করে রাখা কলার কাঁদি। এক জায়গায় আবার অনেকটা এলাকা জুড়ে মাটি চাপা দিয়ে কলা রাখা আছে। পাকানো হচ্ছে সেগুলোকে। তাছাড়া গৃহস্থের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের পাশাপাশি চাষবাসের কাজে লাগে, জলসেচের কাজে লাগে এমন জিনিষ কিনতে দূর দূর এলাকার মানুষের ভরসা ছিল জয়দেব। লাঙ্গল, কোদাল, গরুর গাড়ির চাকার হাল, নানান যন্ত্রপাতি এসব কিনতে ভাঙা মেলাতেই যেন বেশি লোক আসত। মেলা শেষের মেলায় সব কম দামে পাওয়া যায় এই ধারণা টা তো আজকের নয়। তবে গ্রামীণ সমাজে আর অর্থনীতিতে জয়দেবের মেলার একটা ভূমিকা ছিলই।

 ঘুরতে ঘুরতে রাত কখন গভীর হয়েছে টের পাইনি। এক আখড়ায় দেখি পাশেই দাঁড়িয়ে দুই ভিনদেশী যুবক  যুবতী। শুধু মোহিত হয়ে শুনছেনা, গান রেকর্ড করছে। তবে মোবাইলে নয়, ছোট টেপ রেকর্ডারে। বলা বাহুল্য, সেযুগে মোবাইল আমাদের দেশে কেন, তাদের দেশেও জনতার হাতে আসেনি। পরিচয় হতে জানলাম তারা আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া থেকে এসেছে। তাদের উচ্চারণে ‘ফিলাদেলফিয়া’। শুনেছিলাম জয়দেবের মেলায় অনেক দূর দূরান্ত থেকে লোকজন আসে। অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ, শিল্পী সাহিত্যিকরা আসেন। কিন্তু সুখের দেশ ছেড়ে শীতের এই ধুলো ওড়া গ্রামীণ মেলায় আমেরিকার এক যুগল আখড়ায় আখড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, গান রেকর্ড করছে এটা বেশ ভালো লাগলো। তবে চারদিক থেকে ভেসে আসা মাইকের যে তাণ্ডব, তাতে কি রেকর্ড হচ্ছে আর পরে সেটা শুনে ওরা কি বুঝবে কে জানে! কিন্তু যা বুঝলাম, পুরো ব্যাপারটা ওরা খুব উপভোগ করছে। মেলার স্পন্দনটাকে ধরে রাখছে। এরকম মেলা, এত মানুষের প্রত্যক্ষ সংশ্রব এবং এরকম উচ্চকণ্ঠে গানের আসর ওরা কোথাও দেখেনি। ওরা বলছিল, গানের কথা না বুঝলেও গানের সুর এবং বাউলদের পারফরমেন্স ওদের কাছে খুবই চমকপ্রদ। পুরো ব্যাপারটাই ওদের কাছে অভিনব।

 এটাই হয়তো বাউলের মাহাত্ম। বাউলরা তো সুখের সন্ধানে জীবন বাজি রাখেনা, জীবনের গভীরতর অর্থের খোঁজে সুরের বিস্তার করে গানে গানে। কিছু একটা না পাওয়ার বেদনা, একটা মন কেমন করিয়ে দেওয়া সুর সেই গান থেকে ভেসে এসে বুকে বেঁধে। তাতে সহজিয়া বৈষ্ণব সুরের আধিক্য থাকলেও আর দোষের কি? সহজ বলেই তো তা সাধন ভজন না জানা সাধারণ মানুষেরও প্রাণে জায়গা করে নিতে পেরেছে। দেহতত্ত্ব বা লীলাতত্ব কিছুই না বুঝলেও সেই সুর আর নাচ যেকোনো মানুষের ভিতরটাকে ছুঁতে পারে। এখানেই হয়তো তার সার্থকতা। 

 না, মকর স্নান করতে আমরা অজয়ের জলে নামিনি। কিন্তু আমরা না নামলেও হাজার হাজার মানুষ সেই কনকনে ঠাণ্ডার ভোরবেলায় জলে নেমে ডুব দিতে তৈরি। আর মেলার সময় জয়দেবের সেই ঠাণ্ডাকে অনুমান করতে হলে কলকাতার ঠাণ্ডা থেকে অনায়াসেই ৪/৫ ডিগ্রী কমিয়ে ধরে নেওয়া যায়। এক ব্রাহ্মমুহূর্তে সেই জলে স্নান করলে ঘুচে যাবে যত কালিমা, অর্জন হবে গঙ্গাস্নানের পুণ্য, এই বিশ্বাস তো জন্মজন্মান্তরের। কারণ অজয়ের জলে তখন গঙ্গার ধারা বয়ে চলে উজানে। স্বয়ং জয়দেব এই বার্তা পেয়েছিলেন স্বপ্নে। প্রমাণ স্বরূপ উজানে ভেসে আসবে একটি ফুল। এই লোকবিশ্বাসের জন্য তো কোন যুক্তি লাগেনা, কোন তর্কে এর কোনো আবেদন কমানো যায়না একটুও। ধীর গতিতে বয়ে যাওয়া অজয় নদের হাঁটু সমান জল, ভোরবেলার একটি মুহূর্ত আর হাজার হাজার বিশ্বাসী মানুষ এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। সেই জন্যেই তো জয়দেবে আসা।

 কিন্তু যারা আমাদের মত প্রথাবিরোধী বা অবিশ্বাসী মানুষ, তারা চলে যায় উল্টোদিকে। আমরা তিন বন্ধু  ভোরবেলার সেই ব্রাহ্মমুহূর্তকে উপেক্ষা করে চলে গেলাম হরিদাসের আশ্রমে। বাঁশ ত্রিপল কাপড় ইত্যাদি দিয়ে অস্থায়ী আস্তানা যেমন হয় আর কি। না, সেখানে কোনো গানের আসর ছিলনা। ছিল এক উদার মানুষের আহ্বান। তিনি কুমুদ দা। সর্বজনপ্রিয় কুমুদকিঙ্কর। তাঁকে চেনেন না এমন মানুষ গোটা বীরভূমে প্রায় নেই। আমি সেই সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়কার কথা বলছি। জেলার ভি আই পি থেকে সাধারণ মানুষ সবাই তাঁর পরিচয় জানেন। কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের কাছে থাকতেন তিনি। তাঁর দেখাশোনা করতেন। নিজেকে গর্ব করে বলেন তিনি কবির চাকর ছিলেন। তাই নিজেকে পরিচয় দিতেন কুমুদকিঙ্কর নামে। সাদা ধুতি লুঙ্গির মত করে পরা, সাদা ফতুয়ার উপর কাঁধে একটি খদ্দরের উত্তরীয় চড়ানো নিরহংকারী মানুষটি সবার কুমুদ দা। অল্প সময়ে কাছে টেনে নিতে পারতেন একান্ত আত্মীয়ের মত। এমন মানুষের আশ্রমেই সেদিন ভোরবেলা গিয়ে উঠেছিলাম। ওইরকম শীতের ভোরে বিছানো খড়ের উপর সতরঞ্চি পাতা সেই উষ্ণতায় ঘুম আসতে দেরি হয়নি।

 একটু বেলা হতেই দেখি কে যেন কাঁচের গ্লাসে করে গরম চা নিয়ে এসে ডাকছে। যতদূর মনে হয় তখন কাগজ বা প্লাস্টিকের কাপ ছিলনা। কুমুদ দার সবদিকেই নজর। তাঁর আশ্রমে আমরা সবাই তাঁর অতিথি। কারো আপ্যায়নে কোন ত্রুটি রাখতেননা তিনি। উঠেই দেখি আমাদের পাশেই একটা স্লিপিং ব্যাগের ভিতর শুয়ে আছে সেই ফিলাডেলফিয়ার যুগল। সেই যে কথা হয়েছিল তাদের সঙ্গে মাঝরাত্তিরে, তারপর আমরা যে যার দিকে চলে গেছি। এখন সকালে একই জায়গায় আমাদেরই পাশে ওদের নিশ্চিন্তে খড়ের উপর স্লিপিং ব্যাগের ভিতর শুয়ে থাকতে দেখে আশ্চর্য হইনি। আনন্দ পেলাম এই ভেবে, এরকমও হয়।

 আমরা একটু বেলার দিকে দুর্গাপুর ফিরে আসবো এরকমই ঠিক ছিল। কিন্তু কুমুদ দা তাঁর নির্দেশ ঘোষণা করে গেছেন – এখন কেউ চলে যেওনা। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর যে যেদিকে যেতে চাও যাবে। বড় বড় কড়াইয়ে তখন সেখানেও ফুটছে খিচুড়ি।

 সেখানে পেয়ে গেছিলাম আরও কিছু উৎসাহী তরুণদের। তাদের কেউ কেউ কবি এবং পত্রিকা সম্পাদক। শীতের সকালে সে এক জমাটি আড্ডা। একসময় স্বপনের উৎসাহে শুরু হল কবিতা পাঠ। চিন্ময় আর আমিও বাদ থাকি কি করে! কুমুদ দার আশ্রমে এটাই বিশেষত্ব। বাউলও আছে, শিল্প সাহিত্য নিয়ে আলোচনা কবিতা পাঠ – এসবও আছে। একটু পরেই আসরে যাকে পেলাম তিনি লক্ষ্মণ দাস বাউল। তিনি পূর্ণদাস বাউলের ভাই। সেই ছাউনিতে বসে ঘরোয়া আড্ডার মত পরিবেশে তিনি নানা কথায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলেন আমাদের কাছে। সৌজন্যে অবশ্যই কুমুদ দা। তারপর শুরু করলেন গান। তাঁর উদাত্ত গলায় সেই গানে মুগ্ধ হবেনা এমন শ্রোতা কি আছে? এবার বিদেশি যুগল বেশ সুষ্ঠুভাবে কিছু বাউল গান রেকর্ড করতে পারল। কারণ এই আশ্রমটা অনেকটা দূরে আর সকালে তখন রাত্রির মত মাইকের আওয়াজ নেই।

 কুমুদ দা’র সৌজন্যে দেখা হয়ে গেল সবার প্রিয় আর এক কবির সঙ্গে। আশানন্দন চট্টরাজ, আমাদের আশা দা। বীরভূমের সবার কাছে ঘরের মানুষ, পেশায় শিক্ষক। আমজনতার কবি, মাটির মানুষ। গান লিখেছেন অজস্র। তার মধ্যে কিছু গান স্বপ্না চক্রবর্তীর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু তাতে কি? অভাব তো অতশত বোঝেনা! তাই তাঁর পরিবার, তাঁর সন্তানের একটা চাকরি ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগটা আমরা সবাই বুঝতে পারি। বোঝেন কুমুদ দাও। কিন্তু সবার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া ছাড়া তাঁর আর সাধ্য কতটুকু? তিনি যেন ওই জায়গায় মধ্যমণি হয়ে আছেন তখন। তাঁর কাছে গেলে যোগাযোগ হয়ে যায় এর সঙ্গে ওর। কবি কুমুদরঞ্জনের স্মৃতিকে আঁকড়ে একটি ঘরে নিজের মত করে খুব সাধারণ জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। আর তাঁকে দেখে আমাদের শুধু তখন মনে হচ্ছে যেন তিনিই সেই কবি। কুমুদকিঙ্কর নয়, কুমুদরঞ্জন। তিনিই যেন বলছেন “বাড়ি আমার ভাঙ্গন ধরা অজয় নদীর বাঁকে/জল যেখানে সোহাগ ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে।” বাংলার প্রায় ভুলে যাওয়া একজন কবিকে একজন মানুষ জীবনে এরকমভাবে জড়িয়ে রেখেছেন, তা দেখে আমাদের মনে হচ্ছিল তাঁর মাঝেই যেন সেই কবিকে দেখছি। আর তিনি বারবার তা খণ্ডন করে বলে যাচ্ছিলেন, কবি নই, আমি কবির চাকর, আমি কুমুদকিঙ্কর।

 

                                           ------

 

 

 

Comments

Popular posts from this blog