আসনে বসে খাওয়া-দাওয়া এখন অতীত
-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
রান্নাঘর তখনও ‘কিচেন’ হয়ে ওঠেনি। সেই
রান্নাঘরে বা বারান্দায় পরিবারের কয়েকজন মিলে পাশাপাশি বসে খাচ্ছেন। খেতে বসার স্টাইলটি
একেবারে ঘরোয়া। কেউ উবু হয়ে কেউ বাবু হয়ে বসে। কেউ কাঠের পিঁড়িতে বসে কেউ বা আসনে।
আসনগুলিতে সুতোর কাজ করা, পাশ থেকে বেরিয়ে আছে লাল পাড়ের ঝালর। বাড়ির মহিলাদেরই হাতে
তৈরি।
বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে চলে আসা এই ছবিটিই একসময় ছিল সর্বব্যাপী।
গ্রাম এবং শহরের জীবনেও। তা আক্ষরিক অর্থেই ছিল একেবারে মাটির কাছাকাছি, ঘরোয়া, পরিপাটি।
আড়ম্বরহীন। তা যেমন নিজেদের বেলায়, তেমনি অতিথি এলেও। গ্রীষ্মকাল হলে কারও হাতে থাকত
হাতপাখা। কখনো বা গৃহিনী কিম্বা অন্য কেউ আস্তে আস্তে পাখার বাতাস দিতেন। অন্তত যতদিন
না বাড়িতে বাড়িতে লাইট ফ্যান এসে গেছে।
খাওয়া এবং খাওয়ানো দুটো ব্যাপারেই বাঙালি বেশ উদার। এটা বাঙালির
সংস্কৃতি। তাই খাওয়ানোর ব্যাপারেও তেমনি সমান পরিপাটি ব্যবস্থা। বিয়ে অন্নপ্রাশন বা
যেকোনো বড় অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথিদের খাওয়ানো হত সেই আসন পেতেই। লম্বা করে পেতে
দেওয়া হত শতরঞ্চি, কম্বল এমনকি একফালি জায়গা হলে চটের বস্তা। বসানো হত বারান্দায় আর
উঠোনে এবং আরও কোন প্রশস্ত জায়গায় সামিয়ানা টাঙিয়ে বা ছাউনি করে। তখনও ‘প্যান্ড্যাল’ বা ‘ডেকরেটর’ শব্দগুলি সেইভাবে
জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি সব জায়গায়। এবং প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে কোথাও কোথাও বর্ষার সময় বা
প্রচণ্ড শীতে এরকম আয়োজনে আগে মাটিতে পেতে দেওয়া হত খড়, তার উপরে থাকত শতরঞ্চি ইত্যাদি।
সারিসারি পাশাপাশি বসে সেই পংক্তিভোজন ছিল এক আনন্দের উপভোগ। এর বাইরে আলাদা কোন ব্যবস্থা
ছিলনা। ছিলনা কোন অভিযোগের প্রশ্নও।
অনুষ্ঠান বাড়িতে রান্নাবান্নার ব্যবস্থার দিকটিও থাকত নিজেদের
হাতে। অনেক সময় রান্নার ব্যাপারে পরিবারেরই কেউ একজন ‘এক্সপার্ট’ মানুষ থাকলে তিনিই কয়েকজন সহযোগী নিয়ে পুরো রান্নার দিকটা সামলে
দিতেন। না হলে একজন ভালো “ঠাকুর” এবং তার সঙ্গে
কয়েকজন সহযোগী দরকার হতই। তারই করে দেওয়া ফর্দ মত সমস্ত জিনিষপত্র যোগাড় করে দিলেই
হল। সে এক এলাহি ব্যবস্থা। ক্যাটারিং হীন সেই ব্যবস্থায় বাড়ির একপ্রান্তে ছাউনি করে তৈরি হয়ে যেত বড় বড়
উনুন। বড় বড় হাঁড়ি কড়াই খুন্তি ইত্যাদি বাসনপত্র বাড়িতে না থাকলে সেগুলি এসে যেত পাড়া
প্রতিবেশীর বাড়ি থেকেই। এমনকি অসম্পন্ন গৃহস্থের মেয়ের বিয়েতে বা অন্য কোন অনুষ্ঠানে
রান্নার দায়িত্বটিও সামলে দিতেন প্রতিবেশীদের কেউ এবং, বলা বাহুল্য, বিনা পারিশ্রমিকে।
অনুষ্ঠানের আগের দিনই বাড়িতে বসে যেত ভিয়েন। মিষ্টান্নের আইটেমগুলি তৈরি হত সারা রাত
ধরে। বাড়ির কর্তার তখন সত্যি সত্যিই চোখে ঘুম নেই। ঝকঝকে কলাপাতা কিম্বা শালপাতায় করে
খাওয়ানো হত নিমন্ত্রিতদের। কোমরে গামছা বেঁধে হাসিমুখে পরিবেশনের জন্য রেডি থাকত সেই
বাড়ির লোকজন আত্মীয় স্বজন আর পাড়ার ছেলেছোকরা রা। নিচু হয়ে নুয়ে পরিবেশন করতে করতে
ক্লান্ত হয়ে গিয়েও তাদের মুখের হাসিটি থাকত অমলিন। ছোটদের উপর ভার দেওয়া হত জল নুন
আর লেবু পরিবেশন করার। সে যেন তাদের কাছে এক উজ্জ্বল আনন্দের দিন। হটাতই অনেকটা বড়
হয়ে যাওয়া, দায়িত্ব পালন করতে পারার আনন্দের অনুভব। আর আপ্যায়নে থাকত এক আন্তরিকতার
ছোঁয়া। অতিথিরাও ‘কবজি ডুবিয়ে’ খেয়ে প্রসন্ন
হতেন বেশ বোঝা যেত।
কিন্তু সময় তো সবকিছুকেই পাল্টে দিতে জানে। একসময় যা মনে হত
খুব স্বাভাবিক, যেটি ছাড়া অন্য কোন ব্যবস্থা বা রীতি আর ভাবনাতেও আসতনা, ক্রমশ সেটিই
অভ্যাস থেকে হারিয়ে যায়। ব্যাকডেটেড মনে হয়। এসে যায় নতুন এক স্টাইল। আস্তে আস্তে তা
স্থান করে নেয় একেবারে মনের গভীরে। হয়ে ওঠে একমাত্র ব্যবস্থা। তাই এখন আর মাটিতে বসে
খাওয়ার কথা ভাবতেই পারেনা কেউ। না নিজের বাড়িতে, না নিমন্ত্রণ বাড়িতে। বাড়িতে সুদৃশ্য
ডাইনিং টেবিল, রুচিসম্মত চেয়ার। মেঝেতে নিচু হয়ে বসার জো নেই। শারীরিক কারণেই অনেকের
পক্ষে তা সম্ভব নয়। সেই দিক থেকে ডাইনিং টেবিলই একমাত্র সুরাহা। পরিবারের সবাই মিলে
মুখোমুখি বসে একসঙ্গে ‘লাঞ্চ’ বা ‘ডিনার’ করার মজাটাই আলাদা। সেইজন্য ফ্ল্যাটে তো বটেই, অন্যান্য বাড়ির
মধ্যেও একটি ডাইনিং স্পেস থাকা চাই। একইভাবে নিমন্ত্রণ বাড়িতেও সেই ব্যবস্থা। ক্যাটারার
আর ডেকরেটারস ছাড়া সবকিছু সুচারুভাবে আয়োজন করা অসম্ভব। উনুন তৈরি করা থেকে বাসনপত্র
যোগাড়, কেনাকাটা, ঠাকুর, প্যান্ড্যাল পরিবেশন অতসব ঝামেলায় যাওয়ার রিস্ক কে নেবে! হাতের
কাছেই আছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। তাদের হাতে সঁপে দিলে আর টেনশন নেই। জন্মদিন-বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশন-গৃহপ্রবেশ
যেকোনো অনুষ্ঠান করা কোন ব্যাপার নয় এখন। কে আর অত দেখতে যায় যে ‘আর
একটু পোলাও দিই’ বলে পরিবেশনকারীর সেই আন্তরিক হাত এগিয়ে আসছে কিনা। কিম্বা আরও কতকগুলি
রসগোল্লা পাতে ঢেলে দিয়ে সে বলবে, ‘আপনি খেতে পারেন জানি, ঐটুকু খেতেই হবে’। বরং ঝাঁ চকচকে হলের ভিতর ইউনিফর্ম টাই পরা ক্যাটারিং
স্টাফের যান্ত্রিক ভাবে বলা ‘রাইস’ শব্দটির উচ্চারণেই
এখন সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
-----
Comments
Post a Comment