কীসে তৃপ্তি? কীসে আনন্দ?

-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়


কীসে তৃপ্তি? কীসে আনন্দ? মানুষের জীবনের গল্প অনেক তাই বলে সবার গল্প একরকম নয় এক একজন সুখী মানুষের গল্প এক একরকম আবার যারা সেই অর্থে ঠিক সুখী নয়, তাদের গল্পও আলাদা সুখ দুঃখের ভাবনাটাও এক একজনের কাছে এক এক রকম অনেকের কাছে এক বিলাসিতা অল্প কিছু নির্দিষ্ট রোজগার কিম্বা দিন আনা দিন খাওয়ার বাঁধা রুটিনে অভ্যস্ত জীবন যাদের, তারা সমস্ত চ্যালেঞ্জ সামলে আর সুখ দুঃখের দার্শনিক ভাবনা নিয়ে ভাবতে বসেনা বসলে চলেনা যে পালটে যাওয়া গল্পের মতো তাদের জীবনেও সুখের সজ্ঞা পালটে পালটে যায়

 কথাগুলো মাথায় আসে চারপাশে ঘটতে থাকা কিছু ঘটনা আর চলতে ফিরতে থাকা কিছু মানুষজনকে দেখতে দেখতে না, বিশাল কিছু দার্শনিক বা সমাজতাত্ত্বিক ভাবনা থেকে নয়। সেসব নিয়ে তো অনেকেই অনেক কথা লিখেছেন, বলেছেন সমাজের ভিন্ন মেরুর জীবনযাত্রা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হয়েছে অনেক আমরা যারা ভদ্র-সভ্য একটা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকি তারা ফুটপাথে থাকা মানুষজনের ব্যথা বেদনা দৈনন্দিন জীবনধারণের যন্ত্রণা বুঝবোনা কখনো সত্য আলোচিত হয়েছে নানা ভাবে নানা সময় তথাকথিত আধুনিক মধ্যবিত্ত বাবা মা-রা কত যত্নে কত আদরে মানুষ করে তোলেন তাঁদের সন্তানদের অথচ কত শিশুই জন্মের পর থেকে কোন কিছুই ঠিকমত পায়নাএইসব চালচিত্র বহুরূপে ফুটে উঠেছে বহুবার কিন্তু এর বাইরেও প্রতিদিন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আটপৌরে জীবন চলে যে ছন্দে, যেখানে জীবন ধারণের জন্য ফুটপাথ বেছে নিতে না হলেও, মাথার উপর যেমন তেমন একটা চাল বা ছাদ থাকলেও দৈনন্দিন লড়াইটা খুব মসৃণ নয়, সেরকম জীবনেরও কিছু কথা থাকে সেখানে আমার আপনার মতো অনেকেই মাঝে মাঝে শামিল হই বিশেষ কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সেই জীবনের বয়ে চলারও একটা নিজস্ব ভাষা আছে, দাবি আছে বলা যায়, একটা আলাদা তৃপ্তি আর আনন্দ আছে সেই আনন্দ আর ভরসাটার কথাও কম উল্লেখযোগ্য নয়

 যদিও এটাও ঠিক যে আমরা সবাই ঠিকমতো সেই আনন্দটা উপভোগ করতে পারিনা সেই তৃপ্তিটা নিতে পারিনা নিরাপত্তা-হীনতায় ভুগি ভয় হয় অনেক অজানা আশংকা তৈরি হয় মনে ঘটনাগুলো খুবই ছোট ছোট, দৃষ্টান্ত হিসাবে এমন কিছু আহামরিও নয় হয়তো, অথচ তার ইমপ্যাক্ট কিছু কম নয় সেরকম হলে অযথা আশংকা বা ভয়ের উদ্রেক হতনা মনের মধ্যে ঘরের নিশ্চিত ঘেরাটোপে বাস করে আর ঘরেই তৈরি করা খাবার খেয়ে আমরা সাধারণ মধ্যবিত্তরা একরকমের অভ্যস্ত। সখে সাধে কখনও হয়তো রেস্টুরেন্টে খাওয়া হয়ে যায় কিন্তু নিশ্চিত নিরাপত্তা বোধ যেখানে নেই সেখানে আমরা অসহায় অথচ পাড়ার মোড়ে বড় শিরিষ গাছের তলায় যে তিন চাকার মোবাইল গুমটি দোকানটি,‌ তা থেকে প্রতিদিন দিব্যি টিফিন করে কত মানুষ তারা কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাওয়ালা, কেউ স্কুল বা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ড, কেউ হয়তো কোন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি বয় এমনি আরও কত পেশার মানুষ আসে গাছতলার সেই দোকানে চাঁদমুখ করে তারা খায় মুড়ি ঘুগনি, ফাটা পরোটা আলুর দম, ওমলেট ডিম সেদ্ধ যা খুশি একটু ইনস্ট্যান্ট কফির গন্ধ মেশানো কড়া চা খাওয়ার পর কি তৃপ্তি তাদের চোখেমুখে! আমি সেই তৃপ্তিটুকু দেখেছি এতো কম পয়সায় এত সুন্দর ঢেকুর তোলা খাবার আর কোথায় পাওয়া যাবে! এমন কি সেই দোকানি তাঁর স্ত্রী, যারা দুজনে মিলেই দোকান চালান, তাঁরাও তো সেই একই খাবার দিয়ে টিফিন সারেন আর উচ্চ মাধ্যমিক পড়া মেয়ের জন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দেন কাউকে দিয়ে খুব যে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে সবকিছু হচ্ছে তা তো নয় বরং যেমন সব স্ট্রিট ফুডের দোকানেই হয়ে থাকে, বাসনপত্র ধোওয়া হয় সেরকম ভাবেই সেই একই জলে একবার ডুবিয়ে ঘষে নিয়ে আর একটি পাত্রে রাখা জলে একবার চুবিয়ে নেওয়া ব্যাস, ধোওয়া হয়ে গেল সব রাস্তার ধুলো অনবরত আস্তরণ ফেলছে সমস্ত জিনিষে, মাছিদের সরিয়ে রাখার বন্দোবস্ত যে খুব ফলপ্রসূ তাও নয় তবু কি এক আশ্চর্য জাদুতে সেসব খাবার খেয়েও কারও কিছু শরীর খারাপ হচ্ছে বলে কোন অভিযোগ আসেনা সেই দোকানদার যেন অনাদি কাল থেকেই দোকান চালিয়ে আসছেন সেখানে প্রতিদিন সকালে তিনচাকার ভ্যানের উপর গুমটি টেনে নিয়ে এসে আবার সেই রাত্রিবেলা বয়ে নিয়ে যাওয়া চলছে নিরন্তর কোন বিরাম তো নেই এই রুটিনের!

 এত অনিশ্চিয়তা, ভয় আর স্বাস্থ্যহানির আশংকা। তাহলে কিসে তৃপ্তি? কিসে আনন্দ? এইরকম ভাবে খাওয়া আর খাওয়ানো এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত যত মানুষ সবাই কি খুব সুখে আর আনন্দে আছেন? সবাই কি খুব নিরাপদ? আসলে সবটাই আপেক্ষিক যে যেভাবে চিন্তা করে কত অল্পতে সুখী হতে হয়, কত কমে তৃপ্ত হতে হয় তাদের! সুখের যে উপকরণের জন্য নিরন্তর প্রত্যাশা, সেটি অধরা থেকে যায় বলেই প্রতিদিন তার পিছনে নতুন উদ্যমে আর আশায় ছোটা প্রতিদিন স্বপ্নপুরণের জন্য হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তা থেকে একটু জিরিয়ে নিতে আর পেটের খিদেকে উপশম করতে একটু সেই গাছতলাতেই বসা আর যা হোক কিছু খাওয়া পরিশ্রমের পয়সা খরচ করে সেটুকুই যেন একমাত্র বিনোদন, তাই তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংশয়হীন ভালো লাগা, চিন্তামুক্ত তৃপ্তি এভাবেই চলে যাচ্ছে জীবনের চাকা  

 আর নিরাপত্তা-হীনতার ভয়? তা থাকলে চলেনা যে গাছটির তলায় তিনচাকা ভ্যানের উপর গুমটি দোকান, সেই গাছে ঝড়বৃষ্টির দিনে ঘটতে পারে কোন অঘটন অকস্মাৎ বজ্রপাতে কিম্বা ডাল ভেঙে হতে পারে জীবনহানিও এমন যে কোথাও হয়না তাও নয় কিন্তু সেই আশংকা মনের মধ্যে রেখে দিলে জীবন চলবে কি করে? নিজেদের যতটুকু সুখ আর আনন্দ আর কাস্টমারদের তৃপ্তি সে তো এই দোকানকে ঘিরেই  জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তাই চলমান দোকানকে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয় লম্বা ঝাঁকড়া গাছের নিচেই আশংকা অগ্রাহ্য করে এই আলোছায়াটাই জীবন খেলতে ভালোবাসে বাইরের চাপ দিয়ে ঢেকে রাখতে চায় মানুষের ভিতরের মনটাকে

 

                             -----

Comments

Popular posts from this blog