রূপকথা ও স্বপ্নের সন্ধানে ঋত্বিক
ঘটক
-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
জীবনের শুরু পদ্মার ধারে রূপকথার দেশের স্বপ্ন দেখে। এই স্বপ্নই
তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে সারা জীবন।
যুদ্ধ, মন্বন্তর, দেশভাগ, মেনে নিতে না পারা দাঙ্গার ক্ষত, সবই
স্থায়ীভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে তাঁকে। জীবন যুদ্ধে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছেন কখনও
বা, কিন্তু রূপকথার দেশের স্বপ্ন দেখা মানুষটি কোন দাসত্বের কাছে মাথা নোয়াননি কোনোদিন।
তিনি ঋত্বিক ঘটক। গল্প ও নাটকের সীমানা ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত যিনি চলচ্চিত্রকে নতুন ভাষা
দিয়েছিলেন। করেছিলেন প্রতিবাদের হাতিয়ার।
দেশভাগের যন্ত্রণা, প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে এসে শরণার্থী জীবনের
দু;সহ বেদনা তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। এগুলোই পরবর্তী কালে তাঁর জীবন দর্শনকে প্রভাবিত
করেছিল সবচেয়ে বেশি। এপার বাংলায় এসে আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতে নিতে তিনি একসময় অনুভব
করেছেন যে এপার বাংলাতেও সব আছে। কিন্তু ছোটবেলার সেই রূপকথা আর খুঁজে পাননি তিনি।
সেইটি হারিয়ে গেছিল সারা জীবনের মতো। তিনি আক্ষেপ করেছিলেন যে সেটি না থাকলে তো বাস্তব
থেকে নতুন রূপকথা তৈরি করবার সাধ্য তাঁর নেই।
রূপকথা হারিয়ে পরবর্তী কালে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছেন নতুন
সৃষ্টিতে। সেখানে যুক্তি আছে, ট্রাজেডি আছে, কমেডি আছে। সেগুলি হয়ে উঠেছে বড়দের শিল্প।
তিনি গল্প কবিতা নাটকের জগত থেকে ক্রমশ চলে এসেছেন সেই শিল্পের জগতে। সিনেমার দুনিয়ায়।
তাঁর আজন্ম আকুতি নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়া। যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে নিজের শিল্প সৃষ্টিকে
পৌঁছে দেওয়া। তাই যিনি ছিলেন নাটক অন্ত প্রাণ, নাটক লেখা, অভিনয় করা, পরিচালনা করা
যার কাছে ছিল অত্যন্ত ভালোবাসার, আবেগের, তিনিই একসময় নাটকের সীমাবদ্ধতা অনুভব করে
চলে এলেন চলচ্চিত্রের জগতে। কারণ তিনি সবসময়ই চেয়েছেন তাঁর সৃষ্টিকে বেশি বেশি মানুষের
কাছে পৌঁছে দিতে। তাঁর মনে হয়েছিল একসঙ্গে লক্ষ মানুষের কাছে নিজের কথা এখুনি বলতে
চলচ্চিত্রই একমাত্র মাধ্যম। তাঁর নিজের কথায় “সিনেমা লাখ লাখ লোককে একসঙ্গে একেবারে
complete মোচড় দিতে পারে। এইভাবে আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করবো বলে আসিনি। কাল যদি
সিনেমার চেয়ে better medium বেরয় তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি চলে যাবো”।
তারপর সিনেমা আর ঋত্বিক ঘটক, মিলেমিশে তৈরি করেছে ইতিহাস। ঋত্বিক
ঘটকের ছবি মানেই সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার জীবন্ত দলিল। ১৯৫০ সালে অভিনেতা
এবং সহকারী পরিচালক হিসাবে ছিন্নমূল ছবিতে কাজ করা দিয়ে চলচ্চিত্রের জগতে তাঁর পদার্পণ।
বাস্তববাদী চলচ্চিত্র নির্মাণের যে ধারা, তাতে এই ছবিটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তারপর
নিজের পরিচালনায় ঋত্বিক করলেন একের পর এক ছবি। প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’
যাকে অনেকে মনে করেন বাংলা সিনেমার জগতে প্রথম আর্ট ফিল্ম। কিন্তু কি অদ্ভুত পরিহাস!
১৯৫২ সালে ছবিটি তৈরি হলেও সেটি মুক্তি পায়নি তখন। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘ
২৪ টি বছর। ঋত্বিক ঘটক তখন আর বেঁচে নেই। নাগরিক এর পর একে একে তৈরি করেছেন ‘অযান্ত্রিক’,
‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি
নদীর নাম’ এবং ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’। এই কাহিনীচিত্র গুলির পাশাপাশি তিনি তৈরি করেছেন
একডজন শর্টফিল্ম ও তথ্যচিত্র। কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন অনেকগুলি ছবিতে। আর অসমাপ্তও
থেকে গেছে অনেকগুলি কাজ। পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে নিজে অভিনয়ও করেছেন অনেকগুলি ছবিতে।
তাঁর সমস্ত ছবিতেই ঘুরে ফিরে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন যন্ত্রণা
আর তা থেকে বেরিয়ে আসার তীব্র বাসনা। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছেন জীবনকে, জগতকে। বাস্তবকে
অস্বীকার করে, পারিপার্শ্বিক থেকে চোখ ফিরিয়ে থেকে শিল্প হয়না। আসল কম্প্রোমাইজ করা
তিনি শেখেননি। শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাননি তিনি। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা
ছিল শর্তহীন এবং সম্পূর্ণ। মানুষের জন্যই শিল্প, শিল্পের জন্য নয়। তাঁর কাছে মানুষই
সবকিছুর শেষকথা। মানুষের প্রয়োজনেই তাই বারবার তার চলচ্চিত্রে তিনি হাতিয়ার করেছেন
প্রতিবাদকে। তাঁর কাছে চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। প্রতিবাদের ভাষাও। তার সঙ্গে
সেই স্বপ্নটা কখনও হারিয়ে যেতে দেননি তিনি। বেঁচে থাকার স্বপ্ন, উত্তরণের স্বপ্ন। তাঁর
কথাতেই – ‘মানুষের অবক্ষয় আমাকে আকর্ষণ করে। তার কারণ এর মধ্য দিয়ে আমি দেখি জীবনের
গতিকে, স্বাস্থ্যকে। আমি বিশ্বাস করি জীবনের প্রবহমানতায়। আমার ছবির চরিত্ররা চিৎকার
করে বলে আমাকে বাঁচতে দাও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে বাঁচতে চায়। এ তো মৃত্যু নয়
- জীবনেরই জয় ঘোষণা।’
বাঁচতে চাওয়ার প্রসঙ্গেই এসে যায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিটির কথা,
যেটি তাঁর সবচেয়ে বাণিজ্য-সফল ছবি বলে ধরা হয়, সেখানে বাঁচতে চেয়েছিল নায়িকা। সেটি
আসলে নতুন করে শুরুর আর্তি, হার মেনে না নেওয়ার অঙ্গিকার যা সেই আজন্ম লালিত স্বপ্নকে
খুঁজে যাওয়া। শক্তিপদ রাজগুরুর চেনামুখ গল্প থেকে ঋত্বিক নিয়েছিলেন ছবিটির কাহিনী।
গল্পটির মধ্যে এমন কিছু ছিল যা তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল আর তিনি মনস্থির করে ফেলেছিলেন
তা নিয়ে ছবি করার। মূল গল্পকার শক্তিপদ রাজগুরুর কথায়, “ সাত বছর আমি ঋত্বিকের সঙ্গে
ঘর করেছি। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কুমারী মন’,‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’ পর্যন্ত ওঁর
সঙ্গে ছিলাম। পরে আমি অন্য কাজে মুম্বাই চলে যাই শক্তি সামন্তের কাছে। আমাদের একটা
জমাটি টিম ছিল"।
ঋত্বিকের সিনেমার দর্শন দাঁড়িয়ে ছিল তার নিজের অভিজ্ঞতার উপর।
তাঁর মতে ব্যক্তিগত দর্শন যদি কারও না থাকে তার পক্ষে চলচ্চিত্র নির্মাণ কেন, কোন কিছুই
সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। দেশভাগ, শরণার্থীদের কষ্টের জীবন যাপন তাঁকে ব্যথিত করেছিল সবচেয়ে
বেশি। তা থেকে উদ্ভূত অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটেছিল তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার পাশাপাশি
তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত ভারতীয় ঐতিহ্য। ঋগ্বেদ থেকে আরম্ভ করে সংহিতা, ব্রাহ্মণ,
আরণ্যক, শ্রুতির সমস্ত অংশ। উপনিষদ, পুরাণ এবং মহাকাব্য। তার মধ্যে যে জ্ঞান আছে, সত্য
আছে সেগুলিকে তিনি টেনে আনার কথা বলতেন। পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটে শিক্ষকের ভূমিকা তিনি
বেশি পছন্দ করেছিলেন চিত্র পরিচালকের ভূমিকার চাইতেও। প্রখ্যাত চিত্র নির্মাতা মণি
কাউল, কুমার সাহানির মত অনেক ছাত্র তাঁর ছড়িয়ে আছেন সারা দেশ জুড়ে। সেই ব্যাপারটিকেই
তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন।
তিনি তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের অবক্ষয়ের আর অবিচারের
কথা তুলে ধরেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। বঞ্চিত, শোষিত মানুষের জীবনকাব্যই তাঁর সমস্ত চর্চার
বিষয় থেকেছে চিরকাল। মনে প্রাণে কম্যুনিস্ট মানুষটি অপরিমিত মদ্যপান, হতাশা আর অসুস্থতা
সত্তেও রূপকথার ছবি ভোলেন নি, স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। যে শিশুমনে ছোটবেলায় একদিন রূপকথার
ছবি জেগেছিল, বড়বেলায় সেই মনের প্রকাশ করেছিলেন ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ ছবির মধ্যে। আর
জীবনের স্বপ্ন কে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন বিভিন্ন ছবির চরিত্রগুলির মত। নতুন সৃষ্টিই তাঁর
শেষ কথা। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবির শেষে যেমন দেখা যায় নদীর শুকনো বালি খুঁড়ে বের
করে আনা হয় খাবার জল, শুকনো চরেও গজিয়ে ওঠে নতুন ঘাস, আর তার উপর দিয়ে ভেঁপু বাজাতে
বাজাতে ছুটে আসে একটি শিশু। যা আসলে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। জীবনই জিতে যায়।
শেষ পর্যন্ত।
এই স্বপ্নটাই দেখতেন তিনি। অত্যাচার অবিচার শোষণের থেকে পরিপূর্ণ
মুক্তির স্বপ্ন, নতুন জীবনের স্বপ্ন। সেই প্রসঙ্গেই তাঁর এই উক্তিটি এই সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিক
ঃ ‘ভয় নেই, মরার আগেই দেখে যাব আমরা ভারতবর্ষ মুক্ত জনতার পুরোভাগে, পৃথিবী শোষণের
বাঁধন ছিঁড়েছে, বিজ্ঞান নবজাতক গ্রহের জন্ম দিয়েছে। ভগবান হয়তো পিছু হটতে হটতে গিয়ে
মঙ্গল গ্রহে আড্ডা গেড়েছে – পৃথিবীটাকে বিজ্ঞানের হাতে ছেড়ে দিয়েছে’।
-----
ঋণ স্বীকার ঃ ‘ঋত্বিক’ – সুরমা
ঘটক
Comments
Post a Comment