ধুলো, নাকি সোনা নাকি ধুলোই
-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
ছোটবেলায় একটা কথা প্রায়ই
শুনতাম ঠাকুমার মুখে, অনেককেই আশীর্বাদ করত এই বলে, আমাকেও বলত – সুখী হও, ধুলোমুঠি
কে সোনামুঠি কর।
আসলে এটা সেই চিরকালের
চাওয়া, সন্তান সন্ততির দুধেভাতে থাকার নিশ্চয়তাটুকু পেরিয়ে আর একটু সাফল্য চাওয়া।
তার মানে যে ম্যাজিকের মতো কিম্বা পরশপাথরের ছোঁয়ায় ধুলোকে সোনা করে নেওয়া তা নয়,
আসল অর্থ হলো শিক্ষায় দীক্ষায় কর্মে চেতনায় সাফল্যে আনন্দে জীবনকে
সোনার মত মূল্যবান করে তোলা আর তার উজ্জ্বলতা দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া। সমগ্রতা
দিয়ে জীবনকে অনুভব করা। যখন বর্ষিত হয়েছিল সে আশীর্বাদ, তখন
স্বপ্ন আর সুন্দরের যে পায়ের ধ্বনি ঘুরে বেড়াত ঘর বারান্দা আর উঠোন জুড়ে, সেই আবহ আর নেই। সেখানে এখন মাথা তুলেছে অনেক শরিকের দেওয়াল। সমগ্রতার
পরিবর্তে খণ্ড খণ্ড সুখের ঘরে এখন আমরা ক্ষুদ্রতার সাধনা করি। আমরা ভাল নেই,
বরং কিছুটা ভয়ে ভয়ে আছি। ধূলোমুঠিকে ধরে রাখাটাই এখন পরম প্রাপ্তি
আমাদের।
তাই বলে এমন নয় যে সে সব
দিনে সোনায় মোড়া ছিল সকলের জীবন কিম্বা ফুরফুরে হাওয়াতেই উড়ে চলত প্রত্যেকটি দিন।
কিন্তু ভাই বা বন্ধু বা প্রতিবেশী না হয়েও বিপদে পাশে পাওয়া যেত অচেনা সহযাত্রীকে।
সহযোগিতা আর সহমর্মিতার অনুভব ছিল প্রাণবন্ত। অসুস্থ হয়ে কেউ ফুটপাথে পড়ে থাকলে তা
দেখে মুখ ঘুরিয়ে কাজের অজুহাতে চলে যেতনা পথচারী। প্রতিবেশীর ছেলে মেয়েকে তাদের
ভুলের জন্য বা দুষ্টুমির জন্য শাসন করা যেত আর তা হাসিমুখে মেনে নিত প্রতিবেশী।
শুধুমাত্র ছাত্রকে শাসন করার জন্য কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনোদিন এফ আই আর দায়ের
হয়নি। বিশ্বাস ছিল। ভরসা ছিল। সাদামাটা জীবনের বয়ে চলার নিজস্ব ছন্দ ছিল। সবচেয়ে
বড় কথা শত দারিদ্র আর অনটনের মধ্যেও একজনের জন্য আর একজনের হাতে দুদণ্ড সময় ছিল।
এই ছিলগুলো কখন নেই হয়ে
গেছে টের পাইনি কেউ। তা নিয়ে হতাশা থাকলেও ক্ষোভ থাকলেও তা প্রকাশ করার সাহস এবং
সময় কমে গেছে। কারণ হয়তো - সয়ে যাওয়া। সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত বেঁচে থাকার
লড়াইয়ে ক্লান্ত হতে হতে দিনের শেষে কে আর আলো অন্ধকারের তুলনা করতে যায়! চাওয়া
গুলোকে ছেঁটে ফেলতে হলে দক্ষ মালি হতে হয়না। বেদ উপনিষদ পুরাণ রামায়ণ মহাভারত
শিখিয়েছে ত্যাগ,
তিতিক্ষা, সহিষ্ণুতা, সততা,
নম্রতা, ন্যায়পরায়ণতা, সেসব
তো শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্যই। বাকিদের যেন তা মেনে চলা বারণ। সেই বোধ দিয়ে
ছেঁটে ফেল সমস্ত চাহিদা। কৃচ্ছ্রসাধন করো। বেশি কিছু চেওনা। চাইলেও পাবেনা, কারণ
তা শুধু কিছু কিছু বিশিষ্টদের জন্যই। তারা মুঠো মুঠো ধুলো কুড়িয়ে তার বিনিময়ে নিয়ে
নেবে মুঠো মুঠো সোনা। এই অদৃশ্য অনুশাসন মনে থাকে যেন।
পাইনি বলার সাহসও বড় কমে গেছে।
দাবি করারও জোর নেই। সবকিছু চেপে যাওয়ার একটা গোপন নির্দেশ যেন উঠে আসে চারপাশের
আবহ থেকে। তাই অনেক সময় নিজের কাছেও গোপন করে যেতে হয় অনেক কিছু। বাঁদিকের হাওয়াকে
জানানো যায়না ডানদিকের ফিসফিস উচ্চারণ। আর তাতেই মনের ভিতর তৈরি হতে থাকে আর একটি
অসন্তোষের ছটফটানি। সে তো ইচ্ছের একেবারে বিপরীত। চাইতে না পারার, এগিয়ে যেতে
না পারার, এমনকি ভাবতে না পারার কষ্ট। নেপথ্যের চোখরাঙ্গানি।
কথা ছিল অমৃতের পুত্রকন্যা হয়ে পৃথিবীতে বাঁচবে মানুষ। তাপ শোক ব্যর্থতা বেদনা
হতাশা অপ্রেম ধুয়ে দিয়ে তারা উন্নত হবে, সভ্য হবে, ভালবাসবে। শুধু নিজেকে নয়, সবাইকে। অনাবিল মুক্তি,
হাসি আর আনন্দের উদযাপনে ধুলোমুঠি হয়ে উঠবে সোনামুঠি।
কিন্তু তা অনেকটাই
ব্যাকফুটে। প্রেমের বদলে ভয়ংকর অপ্রেমের আবাহন, ভালোবাসার বদলে মুখে এসিড ঢেলে দেওয়ার
চোখ রাঙ্গানি, স্নেহ আর বন্ধুত্বের বদলে ধর্ষণ করে ছিঁড়ে
খুঁড়ে দেওয়ার নৃশংসতা কি করে ঘটে যাচ্ছে কে জানে! একজনের বিপদে আর একজন সহজে এগিয়ে
আসেনা এখন। এতো নির্লিপ্ত তো ছিলনা মানুষ! অন্যের বিপদে আপদে যে কোন সময় যে কোন
ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চেনা অচেনা সবাই। এরকমই তো ছিল সমাজের কাঠামো।
তাহলে ভিতরে ভিতরে কখন ধরে গেল এতটা ঘুণ? আমরা কি ভুলে
যাচ্ছি আমাদের নিজেদের সত্তা, নিজেদের স্মৃতি, আজন্ম লালিত ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির গরিমা মাখা দিনগুলি? এ কেমন বিস্মরণ?
একটু একটু করে পাল্টে
যাচ্ছে মূল্যবোধ,
ভালোবাসার মানে, ব্যক্তি স্বাধীনতার সংজ্ঞা।
পাল্টে যাওয়াতে দোষের কিছু নেই। পাল্টে যাওয়াই তো জগতের শাশ্বত নিয়ম। স্থিতিশীল আর
কি আছে এই বিশ্বে! আমরা তো নিজেদেরকেও পাল্টে নিয়েছি রক্ষণশীল একান্নবর্তী
পরিবারের বন্ধন থেকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির এপার্টমেন্টের মুক্তিতে। দায় দায়িত্ব
ঝেড়ে ফেলতে শিখেছি মাথা থেকে। একলা হতে চেয়েছি। সম্পর্কে বাঁধা পড়ে থাকা পরিবারের মানুষগুলোর
স্নেহ আর প্রশ্রয়কে ছিন্ন করে ছিটকে এসেছি অনেক দূর, নিজের
পছন্দের বৃত্তে। সে তো নিজের মত করে সুখে থাকার আশাতেই। তাহলে অসহিষ্ণুতার বীজ কি
সেখানেই লুকিয়ে ছিল? বিচ্ছিন্নতার আইডিয়া টি কি সেদিনই
ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল মনের গভীরে! কিন্তু আমরা তো শান্তি চেয়েছিলাম। কিছুটা
প্রাচুর্য নিয়ে আর কিছুটা ঝুট ঝামেলা বাঁচিয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। এক একটি নির্জন
দ্বীপ হয়ে যেতে তো চাইনি কখনও?
না চাইলে কি হবে! সেই
বিচ্ছিন্ন দ্বীপে আমরা সবাই নিজ নিজ সাধনায় মগ্ন। উন্নতির
সাধনা। কেউ কারও কথা ভাবেনা সেখানে। বিনোদনে ব্যস্ত হয়ে থাকে। সামনে এক যাদু জগতের
মায়াবী হাতছানি। সারা বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। শুধু একটু আলতো ছোঁওয়ার অপেক্ষা
মাত্র। অথচ কয়েকটি কবিতা আর গানের বাইরে রবীন্দ্রনাথকে জানিনা, নজরুলকে
চিনিনা। তাজা প্রাণের বিনিময়ে যারা স্বাধীনতা এনেছেন, তাঁরা
তো কবে বাদ হয়ে গেছেন। এখনো যারা জীবন আর জগতের কল্যাণে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন
সবার অলক্ষ্যে, নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম দিয়ে
সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সম্পূর্ণতার দিকে, সুন্দরের
দিকে, তাঁদের আমরা জানিনা। তাঁদের কথা তুলে আনার দায় নেই
কারও। তাঁরা কেউ ‘সেলিব্রিটি’ নন।
কিন্তু সিনেমা জগতের তারকাদের বা ‘সেলিব্রিটি’ মডেলদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। কোন নায়িকার
ডেটিংযে অরুচি, মিডিয়া সেই খবরটি ছবি সহ জানিয়ে দেয় সবার
আগে। স্টারদের জীবনের দৈনন্দিন কাহিনী তাঁদের হাঁটাচলা, কথা
বলার স্টাইলটি পর্যন্ত আমাদের জানা হয়ে যায়। এত কেন গুরুত্ব দেওয়া হয় তাঁদের? আসলে
বিনোদনের ধারণাটা তৈরি করে দেয় মিডিয়া। ভালো থাকার মানেও। অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক
চিন্তাভাবনার পরিবর্তে মননকে আরও পিছিয়ে দিতে চায়। আমরা তাই নিজের গণ্ডির বাইরে
তাকাতে ভুলে যাই। ‘সব ঠিক আছে, আমার তো
কিছু হয়নি’, এই ভেবে পাশের ঘরে লাগা আগুনের দিকে একবার
তাকিয়ে দরজা বন্ধ করি।
এইরকম যে আবহ, মানুষের
সঙ্গে মানুষের সমাজের রাষ্ট্রের যে অভ্যস্ত সম্পর্ক এখনো পর্যন্ত, তাতে কি পরবর্তীকালে
কোন পরিবর্তন আসবে? এখন যখন সারা পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে আছে, বিপন্ন হয়ে আছে সর্বনাশী
ভাইরাসের আক্রমণে, এই সময়টা পেরিয়ে যখন করোনা মুক্ত বিশ্বে পৌঁছব আমরা, আবারও ধীরে
ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠবো জীবনে, তখন কি একটুও পাল্টাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি? প্রচুর
জমানো ধন দৌলত, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, লোভ মোহ কিছুই যে কাজের নয়, চোখে দেখা যায়না এমন
একটা অতি ক্ষুদ্র ভাইরাসই যে চুরমার করে দিতে পারে সমস্ত অহংকার, এটা দেখেও, এটা
উপলব্ধি করেও কি একটুও চেতনা হবেনা আমাদের! মুঠো মুঠো সোনাও যে মুঠো মুঠো ধুলোর
মতই মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে কখনো এটা দেখেও নয়!
তার জন্য কিছু অপেক্ষা
করতেই হবে। ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা। শেষ পর্যন্ত নতজানু হতে হবে আবহমান জীবনের
কাছেই যা দারুণ দুঃসহ দিনে ভেঙে পড়ার মুহূর্তগুলির সঙ্গে আবার সমন্বয় ঘটিয়ে দেবে
হাসিখুশি সচ্ছল জীবনের, যখন উজ্জ্বল রোদ্দুরে স্নান করা নরম ঘাসের উপর আবার মসৃণ
হেঁটে যেতে পারবো। তখন যেন দাবি করতে পারি – শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থে জঙ্গল পুড়িয়ে
দেওয়া নিষ্ঠুর হাতগুলিকে নিরস্ত করো। আগুন যদি জ্বালতেই হয়, আগুনের পরশমণি জ্বালাও, চেতনায়
ঔজ্জ্বল্য আসুক। নাহলে ধুলোমুঠি কে সোনামুঠি করবে কে?
-----
Comments
Post a Comment