সেদিনের কালবোশেখি, অব্যর্থ ঢিল, কাঁচা আম আর কৃষ্ণচূড়া                                          

-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

 

বৈশাখের কিছু আব্দার থাকে। চিরকাল পূরণ হয়ে এসেছে সেই আব্দার। একটু কালবোশেখি, কয়েকটি অব্যর্থ ঢিল        যেগুলি কাঁচা আ্মের থোকার দিকে ছুটে যাবে সবার চোখ এড়িয়ে, আর কৃষ্ণচূড়া। আলো-ছায়ার কাটাকুটি খেলায়     যখন উৎসাহ দেয় ঝলসে দেওয়া দুপুরের রোদ, ঝুম মেরে থাকে চারপাশের প্রকৃতি, অজানা আশংকায় গাছে গাছে            কথা চালাচালি  হয় ফিসফিস, তখন তাদের ডালপালায় লেগে থাকা আলতো বিষণ্ণতা জেনে যায় পিপাসার্ত          পাখপাখালি। দুপুরের ভাত-ঘুম লেগে থাকা চোখে গৃহস্থও বুঝে নিতে চায় ঘোরলাগা আকাশের মনোভাব। হঠাৎই      দমকা বাতাস, শনশন আওয়াজ। উষ্ণ স্তব্ধতাকে ফালাফালা করে দিয়ে ছুটে আসে হাওয়ার প্রবল ঢেউ। চঞ্চল হয়ে              ওঠে গাছেরা। কেঁপে ওঠে টিনের চাল, দড়াম আওয়াজে বন্ধ হয়ে যায় খিড়কীর দরজা। ধুলোয় ঢেকে যায় চরাচর।          উন্মত্ত ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি নিয়ে আসা কালবৈশাখী লণ্ডভণ্ড করে দেয় সামনে যা পায়। তখনই ভর্তি দুপুরেও নেমে                আসে অন্ধকার। কবি  মোহিতলাল  মজুমদারের  ভাষায়  “দিবসের  ভাগে  টানিয়া  খুলিছে  বেণিবন্ধন  সন্ধ্যার”।

 দুপুর বা বিকেলের গোড়াতেই সন্ধ্যার অন্ধকার নিয়ে আসা, আচম্বিতে কিছুটা তছনছ করে দিয়ে আবার শান্ত স্নিগ্ধ রোদ ঝলমল বিকেল ফিরিয়ে দেওয়া, যেন কিছুই হয়নি, অভিজ্ঞজনেরা জানেন, এটাই ছিল বৈশাখের অতি প্রিয় আব্দার।     কিন্তু কালবৈশাখীর সে দিন গেছে। হয়তো সেও জেনে গেছে এখন বিশ্বায়নের যুগে তার এভাবে তোলপাড় করা        এটিটিউড শোভা পায়না। সবাই সব খবর রাখে পৃথিবীর কোন প্রান্তে কখন কি ঘটে যাচ্ছে। কোথায় স্নো ফলে         স্কিড করে যাচ্ছে রাস্তার গাড়ি, কোথায় কেমিক্যাল এ্যটাকে শেষ হয়ে যাচ্ছে জীবন। এসময় দিনে দুপুরে অন্ধকার             নিয়ে এসে ধ্বংসলীলা চালিয়ে আবার ধুলো কালি ধোওয়া উজ্জ্বল বিকেল এনে দেওয়ার ম্যাজিক্যাল রোমান্টিসিজম    চলেনা। অত সময় নেই কারো হাতে। ধ্বংস এখন ধ্বংসই, তার কোন সৃষ্টির দায় নেই, সৌন্দর্যের ধারণা নেই।        তাই কালবৈশাখীর সেই রূপও আজ আর নেই। সে এখনও আসে, তবে চলে যাওয়া বিকেল বা সন্ধ্যায়, রীতিমত       ফোরকাস্ট  দিয়ে।

 অথচ কালবৈশাখী একসময় ছিল যেন বাঙালির জীবনের  অংশ। চৈত্র থেকে পুড়ে যেতে থাকা মাটি, শুকিয়ে                    যেতে থাকা গাছপালা আর গরম হতে থাকা বাতাস একযোগে মানুষকে জানিয়ে দিত তারা কি চায়। তুলকালাম               করা ঝড়, চোখ ঝলসে দেওয়া বিদ্যুৎ, আর ভয়ংকর মেঘের গর্জন। যেন ধ্বংস হয়ে যাবে সবকিছু নিমেষেই। ভেঙে           পড়ত ঝড় সামলে নেওয়া বড় গাছগুলিরও কিছু ডাল। উড়ে যেত বেশ কিছু ঘরের চালা। শহরের কোন          বাড়িতে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ত জানলার কাঁচ। সর্বনাশা ঝড় আর বৃষ্টির সঙ্গে ঘনঘন চমকে দেওয়া         বজ্রপাত আর বিদ্যুতের ঝলকানি ঘরের মধ্য আটকে রাখত আদ্যোপান্ত বাহিরমুখী মানুষকেও। কিছুক্ষণ  ধ্বংসলীলা        চালিয়ে যখন থেমে যেত ঝড়বৃষ্টি,  আবার কালো মেঘ সরিয়ে সূর্য ভেসে উঠত আকাশে, প্রকৃতি যেন স্নান করে                হেসে উঠত তখন। গ্রামের রাস্তা দিয়ে বয়ে যেত বৃষ্টির জল। অতি যত্নে আর ভালোবাসায় বোনা বাবুই পাখির      কয়েকটি বাসাও পড়ে থাকত গাছ থেকে ছিঁড়ে। আর থাকত চারপাশ জুড়ে একটা সোঁদা গন্ধ, একটা স্বস্তি আর                শান্তির নিশ্চয়তা।

 এছাড়াও বৈশাখের সুনসান দুপুর ডেকে নিত কিছু ডানপিটে শিশু কিশোরকে। ভূতে মারবে ঢিল এই ভয়কে অগ্রাহ্য            করে তারা নিজেরাই ঢিল সংগ্রহ করে বড়দের চোখ এড়িয়ে চলে যেত রাস্তায় ঝুঁকে পড়া কোন আমগাছের নিচে,             অথবা বাগানে। হাতের অব্যর্থ ঢিল অথবা লাঠির একটা টুকরোর মত ছোট্ট একটা কিছু যা পাওয়া যেত তাই ছুঁড়ে      দিত কাঁচা আমের থোকায়। নিশ্চিত পড়ে যেত কয়েকটি  আম। তারপর কজনে মিলে সে এক অদ্ভুত আনন্দের উদযাপন।

 আর কৃষ্ণচূড়া? বৈশাখ মানেই তো অঢেল কৃষ্ণচূড়ায় আকাশ রঙিন। নীলের  ক্যানভাসে  দিগন্তে  যেন  আগুন জ্বলে।    সামনে রবীন্দ্রজয়ন্তী। কৃষ্ণচূড়া ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ।  তাই প্রকৃতি আগে থেকেই সাজিয়ে রাখে সম্ভার। সেই কৃষ্ণচূড়া            ফুল নিয়ে শিশু কিশোরদের একটি খেলা বৈশাখের দুপুরের আর এক অনুষঙ্গ। ঠিক ফুল নয়, ফুলের ঠিক মাঝখানে       যে একটি দণ্ড থাকে সেইটি নিয়ে। তার একেবারে ডগায় একটি আঁকশি। দুজনের মধ্যে যার হাতের আঁকশি                   অন্যের আঁকশিটিকে ছিঁড়ে দিতে পারবে, সেই জিতবে।  খুব  মামুলি,  কিন্তু  আনন্দের  কিছু  কম  পড়তনা।

 কালবৈশাখী এখনও আছে, সেই রূপ আর নেই। এখন আর বৈশাখে সে ঘন ঘন  নিয়ম করে দুপুরেই সন্ধ্যাকে                   নামিয়ে নিয়ে আসেনা। ক্লাইমেট চেঞ্জ বা প্রকৃতির খামখেয়ালিতে পড়ে সে এখন অনিয়মিত আর শান্ত হয়ে  গেছে     অনেকটা। শিশু কিশোরদের এখন আর ঢিল ছুঁড়ে আম পাড়তে যাবার সময়ও নেই, উপায়ও নেই। উন্মুক্ত আমের        বাগানও নেই। আর কৃষ্ণচূড়া অবহেলায় পড়ে থাকে গাছের নিচে,          রাস্তায়, বাগানে।  সেই ফুল নিয়ে খেলার কথা কোন শিশু ভাবতেই পারেনা।

                                                                                                                       

------

 

 

Comments

Popular posts from this blog