চিকিৎসকরা যখন
ছিলেন অভিভাবক
-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
আগেকার সিনেমায়
দেখা যায়, বাস্তবেও দেখা যেত
একটা চেনা দৃশ্য। বাড়িতে অসুস্থ কাউকে দেখতে এসেছেন ডাক্তারবাবু। তারপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা
করার পর প্রেসক্রিপশন লিখে আর প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে তিনি যেই তাঁর ব্যাগটি নিয়ে চলে
যেতে উদ্যত, অমনি বাড়ির কেউ
তাঁর হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে নেন। তাঁকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আসেন। এমন নয় যে ডাক্তারবাবু
ছোট্ট ব্যাগটি বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না। তাঁর নিজের বাড়ি বা ডিসপেনসারি থেকে আসার সময়
তিনি তো সেটি নিজেই নিয়ে এসেছেন। হয়তো গাড়িতে বা রিক্সাতে করে এসেছেন, ফিরেও যাবেন একই ভাবে। কিন্তু এই দৃশ্যটি
থেকে আসলে যে ছবিটি উঠে আসে,
তা হল ডাক্তারদের সমাজ খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে, সম্মানের চোখে দেখে। তাই এই সৌজন্য প্রদর্শন।
হয়তো সাধারণ ভাবে
এই সময়েও এটাই প্রকৃত চিত্র,
বিচ্ছিন্ন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া। কিন্তু মাত্র কয়েক দশক আগেও ডাক্তার রোগীর
সম্পর্কটা ছিল আরও গভীর। ডাক্তারের উপর রোগীর ছিল অগাধ ভরসা, নিরঙ্কুশ শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস। ডাক্তারবাবু
সম্বোধনেই বোঝা যায় তাঁদের সম্বন্ধে মানুষের সমীহ কতখানি। শুধুমাত্র পেশার কারণেই ডাক্তাররা
হয়ে উঠতেন সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। অন্য অনেকের থেকে তাঁদের আসন অনেক
উঁচুতে। আর পেশাগত কারণ ছাড়াও সাধারণ ভাবে ডাক্তার মানেই অত্যন্ত বুদ্ধিমান একজন ভালো
মানুষ, সৎ, উদার, শারীরিক অসুস্থতায় তো তিনিই একমাত্র ত্রাতা, কোন কিছুতে তাঁদের অসম্মান হয়, এরকম
কিছু করা কেউ কল্পনাও করতে পারতনা। বিনিময়ে ডাক্তারবাবুরাও রোগীর জন্য উজাড় করে দিতেন
তাঁদের জ্ঞানবুদ্ধি মত ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়াও সহমর্মিতা, সহানুভূতি। রোগীর কপালে শুশ্রূষার হাত রেখে
মুখের কথাতেই বাড়িয়ে দিতে পারতেন তার মনের জোর। রোগী অন্তত এটুকু বুঝতে পারত যে সে
এখন অনেকটা নিরাপদ। ডাক্তারের ভিজিট বা ফিজ-এর ব্যাপারটি থাকত অনেকটাই গৌণ।
ছবিটা একইরকম ছিল
গ্রামে, এমনকি শহরেও। এবং সাধারণ ভাবে গ্রামে চিরদিনই ডাক্তারের অভাব। ভরসা বলতে গ্রামীণ
স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বাড়াবাড়ি কিছু হলে আরও দূরে বা জেলা সদরে হাসপাতাল। এরকমই প্রত্যন্ত
কোন গ্রামের ডাক্তার হয়তো তাঁর সারাটি জীবন উৎসর্গ করে দিতেন আশেপাশের অঞ্চলের মানুষের
সেবায়। স্কুলের প্যারাগ্রাফ লেখার জন্য যেমন ছাত্রছাত্রীরা লেখে তেমন নয়, আক্ষরিক অর্থেই তাঁদের কাছে ডাক্তারি মানে
ছিল আর্তজনের সেবা। তখন চালু ছিল কাঁচের শিশিতে মিক্সচার ওষুধ। রোগীকেই নিয়ে যেতে হত
শিশি। কিছু পাউডার কিছু তরল শিশিতে ঢেলে তাতে মিশিয়ে দেওয়া হত পরিমাণ মত জল। তারপর
সরু একফালি কাগজ প্রয়োজন মত কয়েকটি ভাঁজ করে তার কোণাগুলি কাঁচি দিয়ে কেটে মাপ তৈরি
করে তা আঠা দিয়ে শিশির গায়ে লাগিয়ে দিতেন স্বয়ং ডাক্তারবাবুই। বলে দিতেন ক’ দাগ সারা দিনে খেতে
হবে। প্রয়োজনে ট্যাবলেট এবং ইনজেকশনও দিয়ে দিতেন তিনি। অবশ্য সব ডাক্তারই যে মিক্সচার
দিতেন তা নয়। ডাক্তারবাবু নাড়ি টিপে আর স্টেথো দিয়ে দেখেই রোগ নির্ণয় করতেন। জটিল কিছু
হলে বলে দিতেন জেলা সদরে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। তাঁর ‘ডায়াগনোসিস’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই
মিলে যেত বড় ডাক্তারের সঙ্গে। সকাল দিকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিজের ডাক্তারখানায়
বসে রোগী দেখে তিনি বেরিয়ে যেতেন ‘ডাকে’। তাঁর সাইকেলের রডে বাঁধা থাকত একটি
ব্যাগ। যেখান থেকে যেমন খবর আসত,
চলে যেতেন দূর দূরান্তের গ্রামে। কখনো ডাক না আসলেও তাঁর অধীনে চিকিৎসায় থাকা কোন
রোগীর খবর নিতে চলে যেতেন ডাক্তারবাবু। গ্রীষ্ম বর্ষা শীতের এই প্রাত্যহিক রুটিন তাঁর
যতটা পেশার কারণে তার চেয়েও বেশি ছিল হয়তো নেশা। দিনে রাত্রে যখনই কেউ খবর দিত, কাছে কিম্বা দূরে, তিনি হাজির হতেন স্টেথোটি গলায় ঝুলিয়ে। রোগী
এবং তার পরিবার পেত বল ভরসা। গ্রামীণ ডাক্তারবাবুদের ডাক্তারি একসময় ছিল এরকমই। তিনি
রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে গেলে শ্রদ্ধায় মাথা নত করত সবাই।
ডাক্তার রোগীর সম্পর্ক
এবং মহানুভব ডাক্তারদের নিয়ে সাহিত্য এবং সিনেমাও কিছু কম সৃষ্টি হয়নি। ‘হাটেবাজারে’, ‘অগ্নীশ্বর’ প্রভৃতি ছায়াছবিগুলি
যারা দেখেছেন তাঁরা মনে করতে পারেন প্রকৃত সেবাপরায়ন সৎ ডাক্তার কেমন হতে পারেন। সমাজের
প্রতিফলনই এসেছে ছবিগুলিতে। আসলে সে সময় চিকিৎসকরা শুধু চিকিৎসাই করতেন না, জড়িয়ে পড়তেন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গেও।
প্রয়োজনে অন্যান্য পরামর্শও দিতেন। ডাক্তারবাবু থেকে হয়ে উঠতেন ডাক্তার-কাকু, বা ডাক্তারজ্যেঠু। সমবয়সীদের কাছে শুধুই
ডাক্তার।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে
সঙ্গে পাল্টে গেছে মূল্যবোধ,
চিন্তাধারাও। রোগী তথা সাধারণ মানুষ আর চিকিৎসকদের মধ্যেকার সম্পর্কটাও আর আগের
মত নেই। অনুভূতিগুলো কিছুটা ভোঁতা হয়ে গেছে। সব ডাক্তারের উপর আর আস্থা বা বিশ্বাস
রাখতে পারছেন না রোগী এবং তার পরিবার। ডাক্তারবাবুদের এখনও শ্রদ্ধার চোখেই দেখে সমাজ, কিন্তু অনেকের লোভ, অত্যধিক ব্যবসায়িক বুদ্ধি
আর পেশার প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব তৈরি করেছে ভুল বোঝাবুঝি। যেকোনো চিকিৎসাই এখন খুব
ব্যয়সাপেক্ষ, জটিল। অনাবশ্যক
‘টেস্ট’, অহেতুক অপারেশন, ভুল চিকিৎসা আর অমানবিক ব্যবহারের অভিযোগ
প্রায়ই উঠে আসে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। হয়তো তাঁদেরও আছে নানা সীমাবদ্ধতা আর প্রতিকূলতা। কিন্তু এই পেশার মতো অতুলনীয় সামাজিক সম্মান আর
পীড়িত মানুষকে সাহায্য করার এক অনন্য সুযোগ আর কোন পেশায় নেই। তাই ডাক্তার রোগী পারস্পরিক
ভরসা আর বিশ্বাসের সম্পর্ক অটুট রাখা, সমস্ত দূরত্ব মুছে দিয়ে চোখ বুজে ভরসা করার এই অবস্থাটা ফিরিয়ে
আনাটাই এই সময়ের একটা চ্যালেঞ্জ।
-----
Comments
Post a Comment