এক দূষণমুক্ত ভুবনের খোঁজে

                     -তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

 

প্রকৃতি বোধ হয় সবকিছুর একটা হিসাব রাখে। কতটা উন্নত হলো মানুষ, কতটা স্বার্থপর আর হিংস্র হয়ে উঠলো আর চরম হঠকারিতায় জেনেশুনে কতটা আঘাত হানলো তার বুকে, সব লিখে রাখে। একটা সময় আসে, যখন সহনশীলতার সব মাত্রা অতিক্রম করে যায়, তখন সেও তা ফিরিয়ে দেয়। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায়, তা সে উন্নত সভ্যতার বড়াই করে যতই আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাক, যতই জ্ঞান আর ক্ষমতার গর্ব করুক।

এভাবে এক একটা বিপর্যয় নেমে এসেছে যুগে যুগে। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রূপে। কখনো ভয়াবহ বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, কখনো খরা, কখনও তীব্র সাইক্লোন। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলস্বরূপ মানুষ হারিয়ে ফেলছে বাসস্থান, হারিয়ে ফেলছে জীবিকা, এবং সামাজিক সুরক্ষাও। বদলে যাচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরণ। কোথাও একফোঁটা জলের জন্য চাতকের মতো তাকিয়ে আছে মানুষ অধীর অপেক্ষায়, বলছে জল দাও, জল দাও। আবার অন্য কোথাও লাগাতার বৃষ্টি ভাসিয়ে দিচ্ছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। ডুবিয়ে দিচ্ছে জমির ফসল। নদীর পাড় ভাঙছে, ধ্বসে যাচ্ছে জনপদ। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের কারণ সবটাই যে মানুষের অজানা তা নয়। সারা বিশ্ব জুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন এর বড় কারণ। যার খুব পরিচিত নাম ক্লাইমেট চেঞ্জ।

এই যে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে, এর জন্য মানুষই অনেকটা দায়ী, এরকমই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সভ্যতার অগ্রগতির নামে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একের পর এক বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, আকাশে বাতাসে জমছে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষ, এ তো মানুষেরই কারসাজি! সীমাহীন লোভ, বাণিজ্য আর মুনাফার মানসিকতা তাকে অনেক কিছু করিয়ে নেয়, শুধু পরিবেশ সুরক্ষার কথাটা বাদ দিয়ে। পরিবেশ যে প্রতিকুল হয়ে যাচ্ছে, দূষিত হচ্ছে এই কথাটাই তো অনেকে স্বীকার করতে চাননা। বিশেষ করে যারা দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেন, যারা পরিবেশকে কলুষিত হওয়ার থেকে বাঁচাতে পারেন!

যে অতিমারির দাপটে সারা বিশ্ব এখন স্তব্ধ হয়ে আছে, যার ফলে স্বাভাবিক জনজীবন একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে, অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, তা তো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই সৃষ্টি হয়েছে। তাহলে প্রকৃতির প্রতি মানুষের যে পুঞ্জিভূত অবহেলা, আজন্মকাল প্রাণীকুলের প্রতি নির্বিচার নিষ্ঠুরতা, তা থেকেই কি প্রকৃতি এমন প্রতিশোধ নিছে? বেড়ে যাচ্ছে সংক্রামক রোগের প্রকোপ? নিজের কৃতকর্মের ফলই কি ভুগতে হচ্ছে মানুষকে?

প্রশ্নগুলো কিন্তু উড়িয়ে দেবার নয়। বরং গভীর ভাবে পর্যালোচনা করবার। কিন্তু সেরকম গুরুত্ব দিয়ে কেউ ভাবছে কি? আজ পর্যন্ত যতটা ক্ষয়ক্ষতি আমরা করে ফেলেছি পরিবেশের, তার প্রতিকার করতে, সম্ভাব্য আরও অনেক বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে পৃথিবীকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতে তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি? একটুও কি সাবধান হচ্ছি আমরা?

অথচ সেই কতযুগ আগে এরকম বিপদের আঁচ উপলব্ধি করেছিলেন একজন কালজয়ী মানুষ, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তিনি জানতেন আত্মঘাতী মানুষ ক্রমাগত প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে, বিষাক্ত করে চলেছে। তাই তিনি সাবধান করে দিয়েছিলেন। ভবিষ্যৎ জীবনের বিপর্যয় নিয়ে তাঁর উৎকণ্ঠা কিছু কম ছিলনা। তিনি অরণ্যদেবতাপ্রবন্ধে বলেইছিলেন, “বিধাতা পাঠিয়েছিলেন প্রাণকে, চারিদিকে তারই আয়োজন করে রেখেছিলেনমানুষই নিজের লোভের দ্বারা মরণের উপকরণ জুগিয়েছে। বিধাতার অভিপ্রায়কে লঙ্ঘন করেই মানুষের সমাজে আজ এত অভিসম্পাতপ্রকৃতিকে ভোগ করা নয়, তার উপর প্রভুত্ব করা নয়, তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠতে হবে, এই পরামর্শ তিনি রেখে গেছেন তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য। আমরা এখনো সেভাবে শুনিনি তাঁর কথা। তাঁর সাবধান-বাণীকে আমল দিইনি। তিনি রবীন্দ্রনাথ, তাঁকেও উপেক্ষা করেছি।

সেই ভুল এখন শুধরে নিতে হবে। এখন পরিবেশের আপতকালীন নিরাময় দরকার। মানুষের ঢেলে দেওয়া বিষ থেকে শুদ্ধ হয়ে ফিরে আসা দরকার। সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার নামে যে উদাসীনতা আর নিষ্ঠুরতা আমরা জীবজগতের প্রতি দেখাতে অভ্যস্ত তার বদল হওয়া দরকার। তার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে সবাইকেই। যার যতটুকু ভূমিকা সেইটুকু যথাযথ পালন করলেই তা সম্ভব হতে পারে। যেখানে দরকার নেই, সেখানে চড়া আলোয় যদি রাতের অন্ধকারকে ছিঁড়েখুঁড়ে দেওয়া হয়, তা জীবজগতকে বিভ্রান্ত করে। প্রকৃতির ব্যালেন্সটা নষ্ট হয়, শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে সেই মানুষেরই জীবনে। এরকম অজস্র ছোটখাট অঘটন সম্বন্ধেও সচেতন হওয়া দরকার।

মানুষই পারে সব। এখন যা চলছে সেটা এক সংকটকাল। যুগে যুগে হয়েছে এমন। অনেক মহামারী নেমে এসেছে পৃথিবীতে, চরম অভিশাপের মত তাড়িত করেছে মানুষকে। কখনো প্লেগ কখনো স্প্যানিশ ফ্লু দীর্ঘ সময় জুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। আতংকের কারণ হয়েছে কখনো কলেরা তো কখনও স্মল পক্স। মূল্যও চোকাতে হয়েছে অনেক। বহু অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে। মানুষই আবার তা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে ঘটেছে এরকম যুগান্তকারী ঘটনা, আবার তা থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা। পাল্টে গেছে জীবনবোধ। শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী যুগের পৃথিবী, দু দুটো বিশ্বযুদ্ধের পরিণাম দেখার পর যে পৃথিবী, তা আগের পৃথিবীর থেকে অনেক অনেক আলাদা। দৈনন্দিন জীবন, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক সবকিছুর উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি। পরিবর্তন এসেছিল শিল্পে সাহিত্যে, ব্যক্তির চিন্তার পরিসরে, সমাজমনস্কতায়, দর্শনে। ভরসা থাকুক, এই মহামারি কেটে যাওয়ার পরও মানুষের চিন্তা ভাবনায়, কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন আসবে। সবাই জীবনের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।

অনেকে বলেন এই অতিমারির প্রকোপে সারা বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন সময় যে লকডাউন হয়েছে, তাতে পরিবেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। বাতাসে বিষের পরিমাণ কমেছে। ওজন স্তরের ক্ষত সারাচ্ছে পৃথিবী নিজে নিজে। আকাশ আরও নীল হয়েছে, প্রকৃতি আরও সুন্দর হয়েছে। পশু পাখিরা অনেক স্বচ্ছন্দ জীবনে ফিরতে পেরেছে। প্রকৃতির যে রূপ তা সে প্রকাশ করছে নিজেই। ব্যস্ত শহরেও গাছের মগডালে বসে ডাকছে পাখি।

এটা হয়তো সাময়িক একটা স্বস্তি। পৃথিবীর মানুষ যখন চলাফেরা করছেনা, বাইরে বেরচ্ছেনা, স্বাভাবিক কাজকর্ম সব বন্ধ করে দিয়ে ভাইরাস থেকে বাঁচতে ঘরের মধ্যে বন্দী জীবন যাপন করছে, যখন গণ পরিবহণ বন্ধ, কল কারখানা থেকে আর বিষাক্ত ধোঁয়া বা গ্যাস তেমন বেরচ্ছেনা, তখন পরিবেশ তো পরিষ্কার হবেই। শুদ্ধতাও ফিরে আসবে। বলা যেতেই পারে যে পরিবেশের একটা সাময়িক উপকার হলো। কিন্তু এ থেকে আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। সাময়িক এই স্বস্তিকে নিজেদের সাফল্য বলে উদযাপনের কোন মানে নেই। এ থেকে তো এটাই পরিষ্কার হয় যে পরিবেশের উপর যে ক্ষত তৈরে হয়ে গেছে তার অন্তত কিছুটা হলেও নিরাময় সম্ভব এবং প্রকৃতি তাই চায়। এটা যেমন তার নিজের জন্য, তেমনি উল্টোদিকে মানব সভ্যতার জন্যও।

তাই এর থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বুঝতে হবে প্রকৃতিও কিছু বলতে চাইছে। পশু পাখিরাও কিছু বলতে চাইছে। দরকার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। দরকার আত্মোলপলব্ধি। যে গভীর সংকট নেমে এসেছে পৃথিবীতে, তা থেকে মুক্তি চাই। মুক্তি আসবেও। তখন যাতে আবার প্রকৃতি আগের মতোই না কলুষিত হতে পারে, অসচেতন মানুষ যাতে আবার ফিরিয়ে আনতে না পারে সেই সাবেকি দূষণ, সেদিকে সক্রিয় নজর রাখতে হবে। তবেই আমরা পেতে পারবো এক দূষণ-মুক্ত ভুবন।

ভরসা থাকুক, সেটুকু মানুষ ঠিকই পারবে।

                                           -----

 

 

Comments

Popular posts from this blog