চিঠি
এখন আর কেউ বলেনা চিঠি দিও
-
তারাশংকর
বন্দ্যোপাধ্যায়
চিঠি মানে খাম পোস্টকার্ড পোস্ট অফিস লেটার বক্স, চিঠি মানে হাতে বল্লম আর পিঠে চিঠির ব্যাগ নিয়ে ঝম ঝম ঘণ্টা বাজিয়ে
রাতভর রানারের ছুটে চলা। চিঠির সঙ্গে এই অনুষঙ্গ গুলো অনিবার্য ভাবে চলে আসে। চিঠি মানে অপেক্ষাতেও থাকা। আগে হয়তো অনেকেই অপেক্ষায় থাকতেন, সেই অপেক্ষার মধুর সমাপনও হত অনেক ক্ষেত্রে, কিন্তু আজ বিকেলের ডাকে কারও চিঠি আসবে সেই আশায় এখন কতজন থাকেন বলা মুশকিল। চিঠিপত্র লেখা এবং চিঠি
পাওয়া আজকের ফোর জি মোবাইল বা হাই স্পীড ইন্টারনেটের যুগে আর মানুষের জীবনে সেভাবে
নেই, অন্তত ব্যক্তিগত স্তরে। ডাক, ডাকঘর, ডাকবাক্স, ডাকপিয়ন
প্রভৃতি শব্দগুলো আস্তে আস্তে যেন অনেক আড়ালে চলে গেছে দৈনন্দিন জীবন থেকে। দুপুর বা বিকেলের ডাকের
অপেক্ষায় থাকা যুবক যুবতীরা সাইকেলের ঘণ্টি শুনেই বুঝে যাবে যে পিওন কাকু এসে গেছে, হাতে এখনই ধরিয়ে দিয়ে যাবে প্রতীক্ষার নীল খাম, সে দিন এখন আর নেই। কলকাতা তার আয়তন বাড়াতে বাড়াতে পিন কোড ৭০০১৫৬ পর্যন্ত
চলে গেলেও হাতে লেখা ব্যক্তিগত চিঠি কোন পোষ্ট অফিসেই উপচে পড়েনা। অবশ্য শুধু কলকাতাই নয়, চিত্রটা প্রায় একই সারা দেশে, এমনকি গোটা
বিশ্বে।
অথচ এই চিঠি ব্যাপারটা মানুষের জীবনে এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তা পাওয়া বা না পাওয়ার
উপরে একসময় নির্ভর করত অনেক কিছু, এবং তা মানুষের ভবিষ্যৎ কর্মসূচীকেও নিয়ন্ত্রণ করত। কারণ সেটিই তো ছিল বার্তা
আদান প্রদানের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। প্রত্যাশা আর ভরসার শেষে হাতে লেখা সেই বার্তা যেন অনেকটা
অবলম্বন হয়েই হাজির হত
মানুষের কাছে।
চিঠি যেন জীবনের এক একটি অধ্যায়ের এক একটা পাতা। কতরকম বর্ণনা, অভিযোগ,
অনুরোধ আর অনুরাগ মাখানো ভাষায় নিজের মনের ভাবকে যতটা সম্ভব সুন্দর ভাবে
প্রকাশ করে তবে পাঠানো। রাগ, অভিমান,
হৃদয়ের উত্তাপ ও ভালবাসাকে অনুভব করা যায় একমাত্র হাতে লেখা চিঠিতেই। সেই লেখায় যে লিখছে তার
যেমন আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, মনের ভার লাঘব হচ্ছে,
তেমনি যার কাছে চিঠি পৌঁছচ্ছে বা প্রাপক যখন চিঠি টি পড়ছে তখন তার কাছেও
অনেকগুলো বন্ধ দরজা জানলা খুলে যাচ্ছে। দূরত্ব অতিক্রম করে কাছে এসে যাচ্ছে প্রিয়জনের শব্দ, গন্ধ স্পর্শ সব। এই গন্ধ আর স্পর্শের ব্যাপারটাও চিঠির একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
দিক। কাগজ আর কলমের যুগলবন্দীতে যে ভাষাচিত্র ফুটে উঠে চিটিতে তা তো নিমেষে জীবন্ত
হয়ে ধরা দেয়ই, হাতের লেখাটি স্পর্শ করে প্রেরকের হাতের স্পর্শও অনুভব করতে পারে
অনেকে। সঙ্গে তার উপস্থিতির গন্ধ। আক্ষরিক অর্থেই কেউ কেউ চিঠি শুঁকে দেখতেও
দ্বিধা করতেননা। রোম্যান্টিক মনের অনেকে আবার চিঠির মধ্যে কিছু সুগন্ধিও মাখিয়ে
প্রিয়জনকে পাঠাতেন যা সেটিকে অন্য সব চিঠি থেকে আলাদা করে তুলত। যুগ যুগ ধরে মানুষ এরকম চিঠির আদান প্রদান করেছে,
অপেক্ষা করেছে, ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থেকেছে। সে চিঠির বিষয় কখনও ভালো খবর, কখনও
খারাপ খবর, সেটা আবার কখন কখনও পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে পাড়া প্রতিবেশি বা পার্শ্ববর্তী
গ্রাম বা শহরের খবর বয়ে এনেছে। চিঠি পেয়ে
মানুষ কখনো দুঃখে বিমর্ষ হয়েছে কখনও বা আনন্দে আত্মহারা হয়েছে। আসলে জীবনের
সবকিছুরই প্রসঙ্গ উঠে আসতো চিঠিতে। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের সুতো হয়ে নীরবে কাজ করে গেছে
হাতে লেখা চিঠি।
তবে চিঠি মানে শুধু পারিবারিক কিছু খবরের আদান প্রদান বা মনের কথা প্রকাশ করে
প্রিয়জনকে পাঠানো তাই-ই নয়, এর থেকেও অনেক
বেশি কিছু। যেমন বিষয়বস্তু অনুযায়ী চিঠির ভাষা স্বাভাবিক ভাবেই এক এক রকম। শব্দবন্ধ ও বাক্যের
মেলবন্ধনে যে ভাষা তৈরি হচ্ছে চিঠি লেখার বেলায়, তা অনেক সময়েই সৃষ্টিশীলতার
পর্যায়ে চলে যায়। শুধু দরকারি কথা জানানোর বেলায় যে ভাষায় চিঠি লেখা হয় তা পাঠককে
কোন একটা বিষয়ে অবগত করতে পারে, আর তার বাইরে যে সব চিঠিপত্র মনের বিশেষ অবস্থার
ভাবনাকে প্রকাশ করে বা আবেগের তাড়নায় লেখা, সেখানে ভাষা হয়ে উঠে সৃষ্টিশীল। অনেক সময় তা চলে যায়
সাহিত্যের পর্যায়ে। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে পত্রসাহিত্য যার আকর্ষণ পাঠকের কাছে অপরিসীম।
মহান কিছু ব্যক্তিত্বের হাতে লেখা চিঠিপত্রের সংকলন এভাবেই পত্রসাহিত্যের মর্যাদায়
উন্নীত হয়ে অমলিন হয়ে আছে। যেমন রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলী। হৃদয়ের কথা এমন উজাড় করে
লিখতে পারা চিঠির মাধ্যমেই সম্ভব। চিঠিপত্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নিজেই ইন্দিরা দেবীর কাছে লিখেছিলেন “আমিও জানি তোকে আমি যেসব চিঠি লিখেছি তাতে আমার মনের সব বিচিত্র ভাব যেরকম ব্যক্ত হয়েছে এমন আর কোনো লেখায় হয়নি”
চিঠি লেখার ক্ষেত্রে আর একটি উল্লিখযোগ্য বিষয় হল কাগজ। শুধু কাগজ দেখেই বোঝা যেত যিনি চিঠি লিখেছেন তার যত্ন আর ভালোবাসা কতটা গভীর। পোস্টকার্ড আর ইনল্যান্ড লেটার ডাকঘর নির্দিষ্ট
কাগজেই লিখতে হয়, কিন্তু খামের মধ্যে কাগজে লিখে যে চিঠি পাঠানো হত সেই কাগজের
আকার আকৃতি রঙ ও গুণমান চিঠিতে লেখা
বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু অলিখিত বক্তব্য পৌঁছে দিত প্রাপকের কাছে। এই
অভিনবত্ব শুধু কাগজে লেখা চিঠির ক্ষেত্রেই সম্ভব।
আর হাতের লেখা? সেও আর একরকম ব্যাঞ্জনার প্রকাশ। সুন্দর হাতের লেখা বা যত্ন
নিয়ে ধরে ধরে লেখা আর বিরক্ত হয়ে বা তাড়াহুড়োর মধ্যে যেমন তেমন করে কিছু লিখে চিঠি
পাঠানো, প্রাপক ঠিক বুঝে নিতে পারে প্রেরকের মনোভাব। তাছাড়াও চিঠি লেখার জন্য
যেহেতু কাগজ কলম ছাড়া আর কোন যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত সাহায্য লাগেনা, তাই লিখতে
বসে শুধু লেখার দিকেই সম্পূর্ণ মনোযোগটুকু থাকে। এই বোধটাও চিঠি পড়ার সময় প্রাপককে
ছুঁয়ে যায়, সেও যে গুরুত্বপূর্ণ কেউ, এই স্বীকৃতিটুকু তার অজান্তেই তাকে একটা
তৃপ্তি এনে দেয়। আসলে চিঠি শুধু চিঠি নয়, আর তার মজাটা এখানেই। হাতে লেখা চিঠির
এটাই স্বকীয়তা।
এই স্বকীয়তাকে মাধ্যম করে গড়ে উঠেছিল কত পত্রমিতালি। দেখা নেই, শোনা নেই, শুধু
পত্র বিনিময়ের মাধ্যমেই গড়ে উঠত বন্ধুত্ব, কখন কখনও তা ঘনিষ্ঠতার পর্যায়েও পৌঁছে
যেত। কলকাতা তো বটেই, পত্রমিতালির মাধ্যমে বন্ধুত্ব করার জন্য কলকাতার বাইরেও কিছু ঠিকানা লক্ষ্য করা যেত।
খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে পত্রমিতালি বিষয়টি স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল।
অবধারিত ভাবে আর একটি চরিত্র চিঠিপত্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, ডাকপিয়ন।
কতরকমের খবর নিয়ে তাঁর চলাফেরা। কতজনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে
তাঁর নিজের মনেও যেন তৃপ্তি নেমে আসে। কখন যেন তিনিও মানুষের আপনজন হয়ে ওঠেণ। তাই
তাঁকে নিয়েও সিনেমা তৈরি হয় এবং সে ছবি দর্শকদের ভালো লাগে।
কিন্তু সেসবের দিন গেছে। চিঠিপত্রের পিছু পিছু এসেছিল টেলিগ্রাম, টেলেক্স,
ফ্যাক্স, তারপর ইন্টারনেট, ই মেল। কিছুদিনের জন্য ছিল পেজার। সেটি শুধু সংক্ষিপ্ত
মেসেজ পাঠানোর জন্য। সবাই অবশ্য পেজার কে খুব অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি।
ইতিমধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসে গেল বিপ্লব। শহর, শহরতলী ও সারা দেশ ছেয়ে গেল
টেলেফোন বুথে। যে কোন বুথ থেকে দেশের
যে কোন জায়গায় ফোন করার সুবিধা পেল সাধারণ মানুষ কিছু মূল্যের বিনিময়ে। তারপর ১৯৯৫
এর ৩১শে জুলাই ভারতে চালু হল মোবাইল পরিষেবা। কলকাতা থেকে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী
জ্যোতি বসু মোবাইলে প্রথম কল টি করেন দিল্লী তে তখনকার টেলিকম মন্ত্রী সুখরাম কে।
সুচনা হল এক নতুন যুগের। পুরো একটি টেলিফোন তাও হাতের মুঠোয় বা পকেটে করে নিয়ে
যাওয়া যায় যেখানে খুশি, ফোনে কথা বলার জন্য আর বাড়ির বা অফিসের ল্যান্ডফোনের কাছে
এসে বসতে হবেনা, মোবাইল থেকেই কথা বলা যাবে যে কোন জায়গা থেকেই, এই বিস্ময় আর
আনন্দ অভিভূত করল সারা দেশকে। তাতে আবার ইমেলে এবং ছোট করে সংবাদ বা এস এম এস পাঠানোরও
সুবিধা আছে। আর কে চিঠি লেখে! বরং বলা ভালো চিঠিপত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি পোতা হয়ে
গেল।
এখন চিঠি লেখার হাত টেনে ধরেছে মোবাইল। স্মার্টফোনের সাহায্যে সোশ্যাল
নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মেসেজ পাঠানোর অদ্ভুত আরাম। কষ্ট করে কে আর চিঠি লেখে! তাই
কমে গেছে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র।
লিখিত চিঠির শেষ উত্তরাধিকার এখন ইমেইল। ১৯৭১ সালে রোমান্ড স্যামুয়েল টমলিসন নামে আমেরিকার একজন
প্রোগ্রামার যেদিন ই-মেইল এর
সূচনা করেন, তারপর থেকেই ক্রমশ চিঠিকে জায়গা ছেড়ে দিতে
হয়েছে। এখন
ঠিকানা মানে ইমেল আই ডি। অপেক্ষার আগেই পৌঁছে যাওয়ার মত দ্রুতগামী। তবে চিঠির মত
যাবতীয় ভাব প্রকাশ করা গেলেও ইমেলের কোন স্বকীয়তা নেই, হাতে লেখা চিঠির মত রোমাঞ্চ
নেই। আরও অনেক কিছু নেই। হাতের গন্ধ নেই, মুগ্ধ করে দেওয়ার মত কাগজ নেই, নেই ডাকপিয়নের
নস্টালজিয়া।
এখন বরং আছে উৎকণ্ঠা।
সে সময় পরিবারের কোন সদস্য বা বন্ধু বা আত্মীয় পরিজন কেউ চলে যাবার সময় বলা হত
পৌঁছে যেন চিঠি দেয়। পৌঁছনো সংবাদের সে চিঠি সাধারণ ডাকে এসে পৌঁছাতে অনেক দিন
লেগে যেত। সেটাই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন চিঠি দিতে কেউ বলেনা। ট্রেনে
বাসে জার্নির সময়টুকুতেই অনেকবার ফোন করে খবর দিতে হয়, নাহলে উদ্বেগ বাড়ে। কেউ
কাউকে বলে দিল ‘পৌঁছে একটা পিং করে দিও’ বা ‘পৌঁছে একটা টেক্সট করে দিও’ এই হল
মডার্ন ফরম্যাট। ই-মেল ও অন্যান্য স্যোশাল মিডিয়াগুলো চিঠির জায়গাটাকে পুরোপুরি
গ্রাস করে নিয়েছে।
সেই সময়ে আর একটা অদ্ভুত মজা ছিল চিঠি লেখার ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন পর
প্রিয়জন বা আত্মীয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর চিঠি না পাওয়ার অনুযোগ আসতই। তখন
একটু নির্দোষ মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যেত, চিঠি তো অবশ্যই দেওয়া হয়েছে, হয়তো কোন
কারণে এসে পৌঁছায়নি। পোষ্ট অফিসের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সে যাত্রা কিছুটা রেহাই পাওয়া
যেত। আর এই চিঠি পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে রোমান্টিক বাংলা ছবি তো এখনও অমলিন
হয়ে আছে।
------
Comments
Post a Comment