কাটা রুটের যাত্রী
-তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
ফাঁকা অটো দেখেই
যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন তাতে ওঠার জন্য। তাঁদের আর দোষ কি? সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে
আছেন একটা অটোর জন্য। একের পর এক অটো আসছেও। কিন্তু যাত্রীরা যেখানে যেতে চান, সেখানে
অটো-চালক যাবেনা। সে পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে – না। ডিউটিতে থাকা ট্রাফিক পুলিশ হয়তো
কোনও সময় ছুটে আসছেন যাত্রীদের সাহায্যে। অটো-চালকের কাছে জানতে চাইছেন রুটের অটো হয়েও
কেন সে পুরোটা যাবেনা। সাইডে মুখ বাড়িয়ে কিছু একটা বলেই ছুট লাগাচ্ছে অটো। খালি অবস্থাতেই।
কারও কিচ্ছু করার নেই।
এরকম অভিজ্ঞতা হয়নি
এমন কোনও যাত্রী বোধ হয় কলকাতা শহর এবং শহরতলীতে পাওয়া যাবেনা। আসলে যে রুটের অটো,
যে জায়গা পর্যন্ত তার যাওয়ার কথা, পিক আওয়ারে সেখান অব্দি সে যেতে চায়না। মাঝখানে কোন
একটা জায়গা পর্যন্ত যাবে – এই তার ঘোষণা। সেখান থেকে আবার সে নতুন যাত্রী নেবে, তাদের
থেকে নতুন করে ভাড়া নেবে, তারপর বাকি পথটুকু যাবে, নাহয় এ পথেই যাত্রী নিতে নিতে ফিরে
আসবে। এভাবে টানা একটা রুটে পুরোটা যাওয়ার চেয়ে মাঝখানে নতুন যাত্রী তুলতে পারলে তার
বেশি উপার্জন হয়। বিশেষ করে কলকাতার বিভিন্ন রুটে চলা অটোগুলির এটাই নিয়ম। পরিচিত ভাষায়
‘কাটা রুট’।
সবিনয়ে বলি, অটো-চালকরা
এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। শুধু প্রতীক হিসাবে কাটা রুট কথাটা শোনানোর জন্যই তাদের প্রসঙ্গ
আনা। তাদেরও প্রয়োজন আছে, বেশি উপার্জনের তাগিদ আছে। তবে যতটা সম্ভব নিয়মনীতি মেনে,
যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখে চলাটাই সাধারণের দাবি। লোভ বা বেশি লাভের তাড়না তো কাম্য
নয়। কিন্তু বৃহত্তর জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘটে যাচ্ছে এই কাটা রুটের খেলা। বড় ক্যানভাস
আর তেমন পছন্দ নয়। খণ্ড খণ্ড করে দাও। এক থাকতে দিওনা। বিচ্ছিন্ন করে দাও। ভেঙ্গে টুকরো
করে দাও। বড় খবরের কাগজগুলিতে যেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ খবর ছাড়া সব খবর সবার জন্য নয়।
বর্ধমান জেলার সব খবর শুধু বর্ধমান জেলার পাঠকরাই পড়তে পারবেন। বাঁকুড়া বা কলকাতা এলাকার
পাঠক জানবেননা সেগুলি। আবার কলকাতা সংস্করণের কিছু পৃষ্ঠা পাবেননা উত্তরবঙ্গের পাঠকরাও।
হয়তো এসবের পিছনে কার্যকরী সুবিধা আছে, যুক্তি এবং বাস্তবতা আছে। কিন্তু সবার উপরে
আছে বাণিজ্য ভাবনা। এবং হয়তো স্বার্থও। অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রেও তাই। আসলে অখণ্ডতাকে
সহজে ম্যানেজ করা যায়না। তাই অখণ্ডতাকে অনেকে মনে করেন একটা আইডিয়া শুধু। কবেই ভাগ
হয়ে গেছে দেশ, ভাগ হয়ে গেছে মাঠ ঘাট পাহাড় পর্বত নদী সময় ঐতিহ্য সংস্কৃতি। ভাগ হয়ে
গেছে বড় সংসার, টুকরো হয়ে গেছে ঘরের উঠোন। এখনও মাঝেমাঝেই উঠে আসে বিচ্ছিন্নতার দাবি।
যেন ট্রেনের প্রতিটি কামরা চাইছে নিজস্ব ইঞ্জিন। বড় কিছু পছন্দ নয়। খণ্ড হতে চাই। ক্ষুদ্র
হতে চাই। যে পাড়ায় একটি মাত্র দুর্গাপুজো হয়ে আসত এতকাল, সেখানেও তা থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে
আসছে আর একটা দল। আয়োজিত হচ্ছে আরও একটা পুজো। খণ্ড হতে চাই। ক্ষুদ্র হতে চাই। একান্নবর্তী
পরিবারের একাত্ম মানুষগুলি পরিসর ছোট করতে করতে আপনজনদের সঙ্গ ছেড়ে এসে উঠেছে বহুতলের
খাঁচায়। পালটে গেছে পরিবারের মানে। ফাঁকা মাঠ আর উন্মুক্ত আকাশের কোন ভবিষ্যৎ নেই।
উদারতা কোন কাজের কথা নয়। ক্ষুদ্র-চিত্তের ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষাই যেন একমাত্র ধ্যানজ্ঞান
-তাই খণ্ড হতে চাই। ক্ষুদ্র হতে চাই। তাই বড় মন ছোট হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। স্থবির হয়ে যাচ্ছে
সংকীর্ণতায়।
এর পিছনে কি দর্শন
কাজ করে কে জানে! সুখের উচ্ছ্বাসে, দুঃখের আঘাতে, নানান সমস্যার অভিঘাতে এমনিতেই আমাদের
জীবন বারবার বিক্ষিপ্ত হয়। হয়তো এক অর্থে সেও এক রকম খণ্ডিত জীবন। তাছাড়া এমনিতেও তো
জীবন অনেক ছোট। অন্তত কবি দার্শনিকরা তাই বলেন। তাকে আরও ছোট করে দেওয়া কেন? যারা এসব
নিয়ে মাথা ঘামায়না তাদের কাছে জীবন মানে এইবেলা বেঁচে নাও। কাল কি হবে ভাবার দরকার
নেই। যেন তারা ভালো করেই জানে যে ভবিতব্য হাতের মুঠোয়।
কিন্তু ‘এখন বাঁচা’র
জন্য ছোট ছোট টুকরো হয়ে যাওয়া যে জীবন, খণ্ড খণ্ড হতে হতে সেখানে তো প্রতিদিনই দেখতে
হয় একধরণের মৃত্যু। প্রেমের, বন্ধুত্বের, সদিচ্ছার, বিশ্বাসের, মুক্তমনের মৃত্যু। সে
তো কাটা রুটের মতোই। পুরোটা যেখানে যাওয়ার কথা, সেখানে কাটা রুটের সওয়ারী হয়ে পৌঁছব
কি করে?
-----
Comments
Post a Comment