একটা শিকল চাই

       -তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

 নানান বন্ধনে মানুষকে আবদ্ধ থাকতে হয় চিরটা কাল। তার সঙ্গে সব সময়েই চলে এক অন্বেষণ। কিছু না কিছু একটার সন্ধানে যেন ব্যস্ত থাকতেই হয়হয়তো তা কোন দুর্লভ সুখ কিম্বা আনন্দ, কোন না দেখা স্বপ্নের সন্ধান। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যে জিনিসটি ছাড়া এক মুহূর্তও তার চলেনা তা হল একটি শিকল। হ্যাঁ, একটি শিকল তথা বন্ধন। শিকল তো আসলে বেঁধে রাখবার জন্যই।

 বলা বাহুল্য, এ কোন হাতে বা পায়ে বাঁধা আক্ষরিক অর্থে শিকল নয়কিন্তু এইরকম হাজারো বন্ধনের মধ্যে অনবরত থাকতে থাকতে মনের মধ্যে এমন একটা অনুভূতির জন্ম হয়ে যায় যে বন্ধন ছাড়া আর ভাবাই যায়না। বাবা মা আত্মীয়স্বজন সহ পরিবারের সবাই, অন্যদিকে পাড়া প্রতিবেশী - সবার স্নেহের আর শাসনের শিকল সব সময়ের জন্য বেঁধে রাখে শৈশবকে। তার প্রয়োজনও আছে একটি শিশুর সার্বিক ভাবে বেড়ে ওঠার জন্য, ভবিষ্যতে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার জন্য। কিন্তু শুধু শৈশব কেন, সারা জীবন ধরেই মানুষ খোঁজে সেইরকমই একটা বন্ধন যা সত্যিকারের শিকলের মতই বেঁধে রাখবে। সেটা হতে পারে কখনো স্নেহ, কখনো ভালোবাসার। কখনো বন্ধুত্বের। হয়তো ঠিক মোহ নয়, মায়াও নয়, তবু কিছু একটায় বাঁধা পড়ে থাকতে ভালোবাসে মন। সেটাকেই সে চেয়ে যায় আজীবন। এমনকি তার প্রাণান্তকর এক চাওয়া যে মুক্তি, সেই মুক্তিও তার কাছে একটা বন্ধনের মত। বন্ধন ছাড়া তার মুক্তি নেই। যখনই সে অনুভব করে কোনো বন্ধন নেই তার, সেই মুহূর্তে মনে হয় সে একা, নিঃসঙ্গ, তার আশেপাশে কেউ নেই কিছু নেই। একসময় অসহ্য হয়ে যায় বন্ধনহীন অবস্থা। তা থেকে মুক্তির খোঁজ করতে গিয়ে খোঁজ পড়ে আবার সেই শিকলের, সেই বন্ধনের

 রবীন্দ্রনাথের কথাতেও তার সমর্থন পাইবন্ধনই আমাদের বাসস্থান। বন্ধন না থাকিলে আমরা নিরাশ্রয়। সে বন্ধন আমরা নিজের ভিতর হইতে রচনা করি। বন্ধন রচনা করা আমাদের এমনই স্বাভাবিক যে, একবার জাল ছিঁড়িয়া গেলে দেখিতে দেখিতে আবার শত শত বন্ধন বিস্তার করি, জাল যে ছেঁড়ে এ কথা একেবারে ভুলিয়া যাই। যেখানেই যাই সেখানেই আমাদের বন্ধন জড়াইতে থাকি। সেখানকার গাছে ভূমিতে আকাশে সেখানকার চন্দ্র সূর্য তারায়, সেখানকার মানুষে, সেখানকার রাস্তায় ঘাটে, সেখানকার আচারে ব্যবহারে, সেখানকার ইতিহাসে, আমাদের জালের শত শত সূত্র লগ্ন করিয়া দিই, মাঝখানে আমরা মস্ত হইয়া বিরাজ করি। কাছে একটা কিছু পাইলেই হইল। এমনই আমরা মাকড়সার জাতি! (বিবিধ প্রসঙ্গ-১)

 এই যে এক বন্ধন থেকে আর এক বন্ধন, এইটিই আমাদের জীবনে সত্যি। একটি শিকল ছিঁড়ে গেলে আর একটি শিকলের সন্ধান, এটা চলতে থাকে না জেনেই, অবচেতনে। স্বীকার করি বা না করি। এ ছাড়া যে কোনকিছুই পূর্ণতা পায়না। কাউকে না বলতে পারলে দুঃখের সান্ত্বনা হয়না, তেমনি আনন্দের কথাও কাউকে জানাতে না পারা পর্যন্ত তা যেন সত্যি হয়না। তার জন্য চাই একটা সম্পর্ক, একটা বন্ধন। যাদের পরিবার আত্মীয়স্বজন বন্ধু বান্ধব সব আছে, তাঁরা যেমন অনবরত একটা অদৃশ্য শিকলে বাঁধা থাকেন অথচ সেটা সবসময় আলাদা করে উপলব্ধি করেন না, তেমনি যাদের সংসারে কেউ নেই, একমাত্র একা, এমনকি কাছের তেমন কোন বন্ধুবান্ধবও নেই, তাঁরাও বাঁধা পড়ে থাকেন কোন না কোন বন্ধনে, বলা ভালো এক অদৃশ্য শিকলে। হতে পারে তা বৃহত্তর কোন সমাজভাবনায় কিম্বা নিজস্ব কোন লক্ষ্য পূরণের কাজে মগ্ন থেকে। কিন্তু সেখানেও আসলে চোখের আড়ালে থেকে যায় অদৃশ্য এক শিকল। যতই কেউ দাবি করুক সে সম্পূর্ণ একা, কোথাও তার কোন বন্ধন নেই, তবু কোথাও না কোথাও থেকে যায় তার একটা অনুল্লেখিত টান, শিকলে বাঁধা পড়ার যে অদম্য আকর্ষণ, তাকে মনের মধ্যে থেকে সরাতে পারেনা।

 আসলে কোন কিছুর সঙ্গে যুক্ত না থেকে জীবন যাপন বড় কষ্টের, সম্পর্ক-বিহীন অবস্থা তথা মনের একধরণের শূন্যতার বোধকে যে মানুষ সব সময়েই এড়িয়ে চলতে চায়, শূন্যতাকে ভয় পায়, তাকে দূরে রেখে যুক্ত থাকতে চায় কোন সম্পর্ক বা বন্ধনে, সেইটিই তো আসলে শিকল। সারাজীবন এই শিকলের সন্ধানে থাকে সেএমনকি পরিবারের অতীতকে জানার যে কৌতূহল আর অন্বেষণ, তার পিছনেও থাকে কোন কিছুর সঙ্গে যুক্ত হবার বাসনা। হতে পারে তা পরিবারের পূর্বসূরিদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনটিকে চিনে নেওয়া, তাঁদের মাহাত্ম্য ও অতীত গৌরবের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিয়ে এক দুর্লভ অনুভূতির আস্বাদ নেওয়া অথবা কোন গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে নেওয়া। সেও একধরণের জড়িয়ে পড়াই।

 সমাজ জীবনের পাশাপাশি এখন ভার্চুয়াল জগতের বন্ধনও কিছু কম নয়। আমি একা, কাছে দূরে তেমন কেউ নেই এই বোধ মানুষকে কুরে কুরে খায়। কেউ ভালবাসুক, কেউ শাসন করুক, কেউ নাহয় তিরস্কারই করুক কোন ভুল কাজের জন্য, কেউ একটু চিন্তা করুক তার জন্য, কিছুটা ভাবুক বা তাকে অন্তত মনে করুক, কোথাও তো বাঁধা পড়ে থাকি - এই বোধটা তাড়া করে বেড়ায় মনকে। তাই যত শিকলের খোঁজ। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও চলে সেই সন্ধান।

 যতই মানুষ নিজের মতো করে একা একা বাঁচতে চাক, একটা বন্ধনের মধ্যে থেকেই তার আনন্দ এবং হয়তো পূর্ণতাও এই যে অতিমারির দিনগুলিতে মানুষ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন, বাধ্য হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধ রাখতে হয়েছে যাওয়া আসা, ইচ্ছেমত মেলামেশা, এতে সে সুখে নেই। বন্ধনের এই শিথিলতা, যুক্ত হতে না পারার এই বাধ্যবাধকতা স্বাভাবিক ভাবেই তাকে কষ্টে রেখেছে। আসলে জীবনযাপনে এই বন্ধনের টানটা থাকেই। না থাকলেই সে এক নির্বাসিত জীবন। কে চায় সেরকম? মহামারী শেষে যত দ্রুত ফিরে আসবে সেই উজ্জ্বল দিন, তত তাড়াতাড়ি সে আবার সরাসরি সম্পর্কের বাঁধনে ফিরে আসতে পারবে। এই শিকলটা যে তার সব সময়েই খুব দরকারি, খুব প্রিয়

 

                                           -----

 

Comments

Popular posts from this blog