কিছু দোটানা কিছু সংকট
-তারাশংকর
বন্দ্যোপাধ্যায়
একেবারে কিছু না থাকাটা বরং অনেক ভালো। সামান্য কিছু থাকা এক
এক সময় বড় দোটানায় ফেলে দেয়, বিড়ম্বনায় ফেলে দেয়। একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে যায় মনের
মধ্যে। কোনটি ছেড়ে কোনটিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কাকে ফেলে কাকে রাখবে সে এক সংকটের মত।
যখন সামর্থ্য থাকে যেকোনো একটির, অথচ প্রয়োজন এবং সাধও জাগে দুটি জিনিষকে পাওয়ার, তখন মনে হয় যেন যদি কোন একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্নই না আসত, তাহলেই যেন ভাল ছিল। কিম্বা কোনকিছু
পাওয়ার কোন সামর্থ্যই না থাকত, তাহলেই
ভালো হতো। অন্তত এই দোটানায় পড়তে হতনা। নিঃস্ব অবস্থায় আর যা হোক কোন দ্বন্দ্ব
নেই। তাছাড়া সেরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি এমন মানুষ খুব একটা পাওয়া যাবেনা হয়তো। শৈশব,
কৈশোর থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত জীবনের যে কোন সময় এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় প্রায়
সবাইকেই। কখনো বা বারেবারে।
এরকম অনেকগুলি ছোট ছোট সংকটের মত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে করতে
চলে জীবনের পরিক্রমা। আজকের যে প্রাজ্ঞ মানুষটি পেরিয়ে এসেছেন অনেক রকম সংকট, কিম্বা
হয়তো এখনও তাঁকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে নতুন নতুন জটিল বিড়ম্বনার, তাঁর কাছে ছোটবেলার
কোন অভিজ্ঞতাও তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ ছিলনা। হতে পারে তা প্রাচুর্যের
অভাব জনিত কিম্বা কোথাও যাওয়া বা না যাওয়া বা অন্য কিছু। কিন্তু দ্বন্দ্বটি ষোল আনার।
যেমন এই ঘটনা টি। অনেকগুলি দশক পিছিয়ে স্কুলের ছটফটে দিনগুলিতে
তখন তিনি কিশোর। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পাওয়া যেত সামান্য কিছু পয়সা। স্কুলের ‘ছোট টিফিন’এ
কিছু খেতে মন চাইত তাই দিয়ে। ‘বড় টিফিন’ তো বেলা দুটোয়। তখন তো একছুটে বাড়ি গিয়ে খেয়ে
আসাটা ছিল প্রতিদিনের রুটিন। কিন্তু ঐ ছোট টিফিনেই পড়তে হত সমস্যায়। স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে
থাকত একজন পাউরুটি বিক্রেতা, আর একজন আইসক্রিম ওয়ালা। পাউরুটি তো বড় একটা খাওয়ার সুযোগ
হতনা তখন। একমাত্র জ্বরজ্বালা হলেই হালকা খাবার হিসাবে মাঝেমাঝে খেতে পাওয়া যেত, তাও
দুধের সঙ্গে। কিন্তু কাঁচা পাউরুটি খাওয়ার মজাই আলাদা। তার সুযোগ তেমন পাওয়া যেতনা।
আবার আইসক্রিম দেখেও মুশকিল হয়ে যেত তাকে পাশ কাটানো। দুধসাদা সুন্দর ডিজাইনের কাঠিসুদ্ধ
আইসক্রিমটি হাতে তুলে নেওয়ার আনন্দের কোন তুলনা হয়না যে। অথচ পকেটে আছে মাত্র পাঁচটি
পয়সা। হয় একপিস পাউরুটি, না হয় একটি দুধসাদা আইসক্রিম। দুটিই সমান প্রিয়, দুটিই হাতে
পেতে মন চায়। কিন্তু যে কোন একটি পাওয়ার ছাড়পত্র
আছে পকেটে। আর তাই পড়তে হত ভীষণ দোটানায়। জীবনের অন্যান্য বড় সংকটের থেকে তার
গুরুত্ব কিছু কম ছিলনা তখন।
এইরকম হাজারো দ্বন্দ্বকে বুকে নিয়ে জীবন বয়ে যায় নদীর মত। সব
সময় যে সোজা পথে তা নয়। কখনো বাঁক নিতে নিতে। আর সেই স্রোতে একদিকে যেমন ভেসে যায় আঁকড়ে
থাকার পুরনো অধিকার, ভেঙে যায় কিছু আধিপত্য, অন্যদিকে তেমনি গড়ে ওঠে নতুন নতুন চর।
সেখানে গড়ে ওঠে জনপদ, একদিন দাপিয়ে বেড়ায় জীবন। এরই নাম চলমানতা। অস্বীকার করা যায়না,
থামিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। ভেসে যাওয়া আর ভেঙে যাওয়ার বিপদ আর অনিশ্চয়তাকে অনিচ্ছায় বরণ
করে নিয়ে ছুঁয়ে থাকতে হয় জীবনকে, যা আবার অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে সময়। সময়ের কোন দায়
নেই জীবন কি পেল কি পেলনা তা নিয়ে বসে ভাবার, অনুশোচনা করার। এক এক সময় কিরকম সংকটে
পড়ে যেতে হয় আর তা থেকে সঠিক রাস্তাটি বেছে নিয়ে তবে এগুতে হয়, সময় তা নিশ্চয় জানে।
সমস্ত দ্বন্দ্বগুলি যে পুরোপুরি সংকট হয়ে ওঠে তা হয়ত ঠিক নয়,
কিন্তু যে পরিস্থিতির মধ্য পড়ে যেতে হয় মাঝে মাঝে তাও তো কম জটিল নয়। পারিবারিক জীবনে,
বন্ধুত্বের বৃত্তে, কর্মক্ষেত্রের দুনিয়ায় এক একসময় ঘনিয়ে আসে এক একরকম সংকট আর দোদুল্যমান
অবস্থায় খুঁজে চলতে হয় সঠিক সমাধান। সিদ্ধান্ত যাই হোক, একটি দিক থেকে যায় অগম্য। মনের
মধ্যে চলতে থাকে চাপা দ্বন্দ্ব। কোন সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল? মন না চাইলেও পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠদের
অনুরোধে ভাগবত পাঠের আসরে উপস্থিত থাকা, নাকি প্রিয় বন্ধুর ডাকে ঐ একই সময়ে তাদের পাড়ায়
জলসা দেখতে যাওয়া? কর্মক্ষেত্রে প্রমোশন নিয়ে অতিরিক্ত কিছু মাইনের বদলে ভিনরাজ্যের
হেড অফিসে বদলি হয়ে চলে যাওয়া, সেখানে আবার নতুন করে সংসার পাতা, নাকি স্থিতাবস্থা
বজায় রেখে নিজের উন্নতির দরজাগুলি বন্ধ করে দিয়ে অন্যদের এগিয়ে দেওয়া আর সারা কর্মজীবন
একই জায়গায় স্থবির থেকে যাওয়া। এরকম বিচিত্র সব দোটানা এসে স্বাভাবিক পথ আটকে দাঁড়ায়
মাঝে মাঝে। সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এধরণের গুরুতর ক্ষেত্রে অবশ্য জীবনের অভিমুখ এক একরকম সিদ্ধান্তের ফলে এক একদিকে ঘুরে
যেতে পারে।
আসলে কিছু কিছু সমস্যা আছে যার সমাধানের রাস্তা খুঁজে নেওয়াটা
খুব সহজ হয়না। ব্যাপারটা অনেকটা ঐ একই রকম। পাউরুটি না আইসক্রিম। ইচ্ছে, ভালো লাগা,
আনন্দ দুটিতেই মিলেমিশে থাকে, তার সঙ্গে থাকে একটা বাস্তব পরিস্থিতি। পকেটে পড়ে থাকা
পাঁচটি পয়সার মতো। যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। আর একটি ইচ্ছাকে চেপে রাখতে হবে না
হয় এড়িয়ে যেতে হবে। নিরুপায় হয়ে হতচকিত দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মানায়না। তা শৈশবে কৈশোর
বা যৌবনে যেমন, পরিণত বয়সেও তেমনি।
কিছু বিড়ম্বনা এসে যেতে পারে জীবনের যেকোনো সন্ধিক্ষণে, যেকোনো
কাজের সূত্রে। সেগুলিই হয়তো আসল সংকট। অনেকদিন আগে এক বন্ধুর মুখে
শোনা একটি শুটিংয়ের গল্প এরকম ঃ কোন এক সিরিয়ালের একটি দৃশ্যের শুটিংয়ে প্রয়োজন ছিল একটি বছর খানেকের বাচ্চার কেঁদে ওঠার। নির্দিষ্ট দৃশ্যটির শুটিঙয়ের সময় বাচ্চাটি অভিনেত্রীর
কোলে দিয়ে দেওয়া হল। শিশুটি কিছুতেই কাঁদলনা। পরিচালক ভেবেছিলেন ওই বয়সের একটি বাচ্চা
তার মা’র কোল থেকে অচেনা পরিবেশে অচেনা লোকজনের মধ্যে এসে একটু কান্নাকাটি করবেই। তাতেই
কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু সে একেবারেই কাঁদলনা। এমন কি অভিনেত্রীর হালকা চোখ রাঙ্গানিতেও
না। বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে উপভোগ করছিল সবকিছু। কয়েকবার শট নেবার চেষ্টা করেও
যখন হলনা, ইউনিটের একজন বাচ্চাটির মা কে অনুরোধ করলেন বাচ্চাটিকে একটু কাঁদিয়ে দেওয়ার
জন্য। রেগে গেলেন বাচ্চাটির মা। জানিয়ে দিলেন, ছেলেকে কাঁদাতে তিনি পারবেন না। ঐটুকু
বাচ্চা তো আর অভিনয় বোঝেনা। তাঁকে তো সত্যি সত্যি কাঁদাতে হবে। সেটা তাঁকে বিনা কারণে
কষ্ট দেওয়া। তা সম্ভব নয়।
সেটি ছিল সেই মুহূর্তে সেই পরিচালকের সংকট।
তাঁর কাজের জায়গা থেকে তাঁর প্রয়োজনটি যেমন সঠিক, আবার শিশুটির মা’র যুক্তিও উড়িয়ে
দেওয়ার নয়। টাকা বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে হলেও একটি নিষ্পাপ শিশুর
মুখ থেকে হাসি মুছে দিয়ে তাকে কাঁদিয়ে তার চোখের জল এনে দেওয়া
নৈতিক দিক থেকে কতটা ঠিক এই সংকটে পড়ে গেছিলেন পরিচালক।
তেমনি ভুলবার নয় এক গরীব চাষির মনের সংকট। তার পোষা ছাগলটি তার
মেয়ের খুব প্রিয়। লালন পালনের দায়িত্ব সেই নিয়েছে। প্রতিদিন তাকে গাছের ডাল ভেঙ্গে
কচি পাতা খাওয়ানো, গা ঝেড়ে দেওয়া সবকিছু নিজে হাতে করে মেয়েটি। খুব মায়া বসে গেছে তার
অবলা জীবটির প্রতি। কিন্তু কিছুদিন পরে তার বাবা যখন ভালো দাম পেয়ে সেই ছাগলটি বেচে
দিতে গেল তখনই তৈরি হল এক সংকট। মেয়েটি কিছুতেই ছাড়বেনা ছাগলটিকে। কেউ নিয়ে গিয়ে তাকে
কেটে তার মাংস বিক্রি করবে এটা কিছুতেই সে সহ্য করতে পারবেনা। একদিকে তার কান্না, আর
একদিকে সংসারের প্রয়োজনেই ছাগলটি বিক্রি করে দেবার সিদ্ধান্ত। গরীব চাষির এই সংকট খুব
একটা হালকা ব্যাপার নয়।
এরকম অনেক জটিলতা আর দ্বন্দ্বের নিরসন হয়না সহজে। ছোট হোক বড়
হোক, এক এক সময়ে এক একরকম তীব্র দোটানায় পড়ে যেতে হয় মানুষকে। সেই শিশুটির মত কঠিন
হয়ে যায় মনস্থির করা। পাউরুটি, না আইসক্রিম, সেই কঠিন বিষয়টির মত।
ঘুরে ফেরে সেই শাশ্বত প্রশ্ন – “To be, or not to be, that is the
question”.
Comments
Post a Comment